আদর পুনাওয়ালা এখন চরম বিপদে

0
15
সেরাম আদর

আদর পুনাওয়ালা এই বছরটা বেশ নায়কোচিত ভাবমূর্তি নিয়েই শুরু করেছিলেন, তা আবার শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। তবে বছরের অর্ধেক পার হওয়ার আগেই তিনি এর বিপরীত দৃশ্যটাও দেখে ফেলেছেন। ভারতসহ অনেক স্থানেই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার সরবরাহ সংকটের জন্য তাঁকেই দায়ী করা হচ্ছে। তবে তাঁর দাবি, এজন্য তিনি বা তাঁর প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট কোনোভাবেই দায়ী নয়। বর্তমান পরিস্থিতি ভারত সরকারের নীতিগত ভুলের কারণেই তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের এই ‘সেরাম ইনস্টিটিউট’। ভারতসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চলমান করোনা মহামারী থেকে পরিত্রাণের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের উপর অনেকটাই নির্ভর করেছিল। সেরামের সরবরাহ প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের টিকাদান কর্মসূচির ভিত্তিই হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের বাইরে অন্য কোথাও টিকা সরবরাহ করতে পারছে না, এমনকি ভারতেও প্রয়োজনমতো টিকা সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে ভারত বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণের ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এই অবস্থায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেরাম ইনস্টিটিউটকে নিয়ে অনেক সমালোচনা চলছে। এর সাথে সমালোচিত হচ্ছেন এই আদর পুনাওয়ালাও। সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী পুনাওয়ালা বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন (জনগণের ভাষ্যমতে তিনি সেখানে পালিয়ে গেছেন)। সেখানকার স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তিনি দাবি করেছেন যে টিকার সরবরাহ সংকটের জন্য এখন সেরাম ও তাঁকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে সেরাম এখন টিকার সরবরাহ আটকে রেখেছে। এমনকি তাঁকে এ ব্যাপারে রাজনীতিবিদ ও সমালোচকদের কাছ থেকে অনেক কটু কথাও শুনতে হয়েছে।

বর্তমান এই সংকটের পেছনে সেরাম বা তাঁর নিজের কোনো হাত নেই দাবি করে পুনাওয়ালা বলেছেন যে সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা যখন কমে আসছিল, তখনো কর্তৃপক্ষ ভাবতেই পারে নি যে ভারতে মহামারী প্রাদুর্ভাবের দ্বিতীয় প্রবাহ শুরু হতে চলেছে। সবাই ভাবছিল যে ভারত মহামারীর গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি খুবই অন্যায় ও ভুল বক্তব্যের শিকার হয়েছেন।

এফটিকে দেওয়া ঐ সাক্ষাৎকারে পুনাওয়ালার ভাষ্য ছিল যে সেরাম ইনস্টিটিউট তার টিকা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় নি, কারণ ভারত সরকার শুরুর দিকে এই প্রতিষ্ঠানকে টিকা সরবরাহের ক্রয়াদেশও দেয় নি। এই অবস্থায় তাঁদেরও মনে হয় নি যে তাঁদের বছরে ১০০ কোটি ডোজের বেশি টিকা উৎপাদন করতে হবে।

গত ১০ দিন ধরে ভারতে করোনার দৈনিক সংক্রমণ গড়ে ৩ লক্ষের বেশি শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে একদিন তা ৪ লক্ষও ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে বর্তমানে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের টিকাদান কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায় চালু আছে। এই কর্মসূচির আওতায় ১৮ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের টিকাদান সম্পন্নের লক্ষ্য আছে সরকারের। কিন্তু বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকার জানিয়েছে যে তাদের হাতে স্থানীয়দের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টিকা নেই। কোনো কোনো রাজ্যে টিকার অভাবে এই কর্মসূচীর বাস্তবায়ন থেমে আছে।

এর আগে এই সপ্তাহেই ব্রিটিশ আরেকটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পুনাওয়ালা। সেখানে তিনি দাবি করেছেন যে টিকা নিয়ে ক্রমাগত হুমকির কারণে নিরাপত্তার ভয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। তবে গত সপ্তাহ থেকেই ভারত সরকার পুনাওয়ালাকে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সুবিধা দিচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে হুমকিগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন যে সেগুলোকে হুমকি বললেও কম বলা হতো। এসব বক্তব্যে যে মাত্রায় প্রত্যাশা ও আগ্রাসন প্রকাশ পেয়েছে, তা বাস্তবে কল্পনার অতীত। সবাই মনে করছে যে তার টিকা পাওয়া উচিত। কিন্তু কেউ এটা বুঝতে পারছে না যে কেন তার আগে অন্য কারো পাওয়া উচিত। তারা বলছে, যে টিকা না দিলে ভালো হবে না। এমন নয় যে তাদের বলার ভাষাটা খারাপ, তবে তাদের বলার ভঙ্গিমায় খারাপ লেগেছে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে যদি তিনি তাদের দাবিমতো টিকা না দিতে পারেন, তাহলে তারা কী কী করতে পারবে। তিনি যুক্তরাজ্যে আরও কিছু সময় থেকে যেতে চান। এর কারণ হচ্ছে তিনি এই পরিস্থিতিতে ফিরতে চাচ্ছেন না। সবকিছু এখন তাঁর ঘাড়ে, কিন্তু তাঁর পক্ষে তা একা করা সম্ভব না।

তবে এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই পুনাওয়ালা বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন। এক টুইট বার্তায় তিনি জানিয়েছেন যে তিনি কিছুদিনের মধ্যেই ভারতে ফিরছেন। যুক্তরাজ্যে তাঁদের অংশীদারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে খুবই চমৎকার একটি বৈঠক হয়েছে। তিনি অতি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছেন যে পুনেতে এখন পূর্ণ মাত্রায় কোভিশিল্ডের উৎপাদন চলছে। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে কার্যক্রম তদারকির অপেক্ষায় আছেন। অন্যদিকে এফটিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে পুনাওয়ালা বলেছেন যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নয়, তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন সাধারণ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে। আগামী সপ্তাহেই তিনি ভারতে ফিরে যাচ্ছেন।

ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ায় এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে সেরাম ইন্সটিটিউটের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মার্চে টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর ভাষ্যমতে, বেশ কয়েকটি ধনী দেশের নেতারা উৎপাদনকারীদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টিকা সরবরাহের ক্রয়াদেশ দিয়েছেন। ফলে টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বাড়াতে ভালোভাবেই সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো বিষয়টিই হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির সরকার টিকা সরবরাহের ক্রয়াদেশ খুবই ধীরগতিতে বাড়িয়েছে এবং টিকার অনুমোদন দেওয়ার পর প্রথম ক্রয়াদেশ দিয়েছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের টিকাদান কর্মসূচীর গতি বাড়াতে গিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে অন্যদেরও ভুগতে হচ্ছে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পৃষ্ঠপোষকতায় কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটিও এখন এই নিয়ে বিপাকে আছে। এ ফ্যাসিলিটিও টিকার জন্য সেরাম ইন্সটিটিউটের উপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু এখানেও টিকা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে সেরাম। ফলে কোভ্যাক্সের উপর নির্ভর করা স্বল্প আয়ের দেশগুলো বিপদে পড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ টিকার জন্য আগাম অর্থ পরিশোধ করে রেখেছিল, তারাও টিকা পাচ্ছে না।

পুনাওয়ালার দাবি, যেসব দেশের সরকার আগাম ক্রয়াদেশ দিয়েছিল, সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে কোন কোন দেশকে ক্রয়াদেশের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, তিনি সেসব দেশের নাম উল্লেখ করেন নি। তিনি বলেছেন যে যদি কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন না আসে তাহলে তিনি মনে করেন আরও ২-৩ মাস তাঁদেরকে কিছুটা সমস্যার মধ্যে পার করতে হবে।

আদর পুনাওয়ালা এর আগে করোনার টিকার মূল্য নিয়েও সমালোচিত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রতি ডোজ টিকা সরবরাহ করছেন ১৫০ ভারতীয় রুপি (প্রায় ১৭২ টাকা) মূল্যে। অন্যদিকে রাজ্য সরকারগুলোর কাছ থেকে এ বাবদ রাখা হচ্ছিল ৪০০ ভারতীয় রুপি (প্রায় ৪৫৯ টাকা) করে। হাসপাতালগুলোর কাছে বিক্রয় করছিলেন ১২০০ ভারতীয় রুপি (প্রায় ১৩৭৬ টাকা) দরে। এই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি রাজ্য সরকার ও হাসপাতালগুলোতে সরবরাহকৃত টিকার দাম প্রতি ডোজ ৩০০ ভারতীয় রুপিতে (প্রায় ৩৪৪ টাকা) নিয়ে আসেন। সেই সময় মুনাফা কমিয়ে রাখার বিষয়টিকে নিজের ‘ঔদার্যের অভিব্যক্তি’ বলে দাবি করে পুনাওয়ালা আরেক দফা সমালোচনার শিকার হয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here