উহানকে ঘিরে উত্তপ্ত বৈশ্বিক রাজনীতি

0
20
উহান করোনা

চীনের জৈবপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ‘উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’ ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববাসীর আলোচনায় নিয়ে এসেছে। মহামারীর জন্য দায়ী ভাইরাস ‘সার্স-কোভ-২’ (নোভেল করোনা ভাইরাস) এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ছড়িয়েছে বলে গত সপ্তাহে একটি মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। এই সন্দেহের ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য তিনি ৩ মাস সময় বেঁধে দিয়েছেন। অন্যদিকে এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে চীন বলছে যে চলমান মহামারীর উৎপত্তির সাথে উহানের ল্যাবের কোনোই সংশ্লিষ্টতা নেই।

শুরুর দিক থেকে বর্তমান পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক মহল নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রকৃত উৎপত্তিস্থল নির্ধারণ করতে গিয়ে গলদ্ঘর্ম হয়েছেন। এমনকি এই ভাইরাস প্রাকৃতিক নাকি গবেষণাগারে উদ্ভাবিত, সে বিষয়েও গবেষকরা নিশ্চিত হতে পারছেন না। তবে তা এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রচুর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালে দাবি করেছিলেন যে উহানের ঐ গবেষণাগার থেকেই করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। তখন এ নিয়েও পক্ষে-বিপক্ষে অনেক তর্কাতর্কি ঘটেছে। এরপর জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর এই আলোচনা কিছুদিনের জন্য ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ নিয়ে তদন্ত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার পর এই বিষয় নিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তাঁর এই নতুন পদক্ষেপের ভিত্তি মার্কিন একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন। মহামারীর প্রাদুর্ভাব শুরুর পূর্বের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এই ভাইরাস সম্ভবত উহানের গবেষণাগার থেকেই প্রথমবারের মতো ছড়িয়েছে। অন্যদিকে চীন এই বিষয়কে অস্বীকার করে বলছে যে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন যে ভুল তথ্য দিতে পারে – ইরাক যুদ্ধের সময়েই তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এ নিয়ে ২ দেশের মধ্যে চলমান উত্তপ্ত বাদানুবাদের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সার্বিক বিষয় নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বক্তব্য রেখেছে। সংস্থাটি বলছে যে রাজনীতির বিষাক্ত অনুপ্রবেশ করোনা ভাইরাসের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানের কার্যক্রমে ব্যঘাত ঘটাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল যেখানেই হোক না কেন, সম্পূর্ণ বিতর্কটি উন্নত দেশগুলোর জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণার এক অন্ধকার অধ্যায়কেই তুলে ধরেছে। এর আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে যে প্রযুক্তিতে অগ্রসর উন্নত দেশগুলো অনেকদিন যাবত জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘গেইন অব ফাংশন’ হিসাবে পরিচিত এসব গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, জীবাণুর বৈশিষ্ট্য বদলে দেওয়ার মাধ্যমে এগুলোকে আরও প্রাণঘাতী ও টিকা প্রতিরোধী করে তোলা। বিজ্ঞানীরা তাঁদের পরীক্ষাগারে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এগুলো নিয়ে গবেষণা চালান। এর মধ্য দিয়ে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া যদি গবেষণাগারের নিরাপত্তা বলয় এড়িয়ে বাইরের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) জানাচ্ছে যে ২০১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিছু ভাইরাস নিয়ে এমন গেইন অব ফাংশন গবেষণায় অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তখন মার্কিন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কঠোর গাইডলাইনও তৈরি করেছিলেন। ২০১৭ সালে এগুলো নিয়ে আরও কিছু নিয়মকানুন চালু হয়েছিল। কিন্তু এমন গবেষণা বন্ধ হয় নি এবং প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে এসব গবেষণা মার্কিন অর্থায়নেই চলছে। এমনকি করোনার উৎস হিসেবে অভিযুক্ত উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির গবেষণাগারেও মার্কিন অর্থায়নেই এমন গবেষণা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে যে ওয়াশিংটন ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত উহান ইনস্টিটিউটে পরিচালিত এমন এক গবেষণায় মোট ৬ লক্ষ মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ জন বিজ্ঞানী এই গবেষণা চালিয়েছেন। এর বিষয়বস্তু ছিল বাদুড় থেকে সংক্রমিত করোনা ভাইরাস (করোনা ভাইরাস বলতে প্রকৃতপক্ষে সমজাতীয় একগুচ্ছ আরএনএ ভাইরাসকে বুঝায়, যেগুলো স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখির মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম। সার্স, মার্স, নোভেল করোনা ভাইরাস — এগুলোর সবই করোনা ভাইরাসের উপপরিবারভুক্ত ভাইরাসের উদাহরণ) মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ’ এর পরিচালক অ্যান্থনি ফাউসি গত মাসে মার্কিন সিনেটে অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

চীনের ‘ব্যাটউইম্যান’ হিসেবে পরিচিত শি ঝেংলি ঐ গবেষণাকারীদের মধ্যে অন্যতম। গবেষকরা ভিন্ন ২টি করোনা ভাইরাসের নতুন একটি সংকর ও আরও ভয়ংকর প্রজাতি উদ্ভাবন করেছেন। ২০১৫ সালে ‘নেচার জার্নাল’ এ ঐ বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রেও উঠে এসেছে যে এই নতুন ভাইরাস মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম। তবে শুনানিতে ফাউসি দাবি করেছিলেন যে এটি কোনো ধরনের গেইন অব ফাংশন-সংশ্লিষ্ট গবেষণা ছিল না।

২০১৫ সালের ঐ গবেষণায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল যে ‘গেইন অব ফাংশন’ সংশ্লিষ্ট গবেষণাগুলো অনেক বেশি বিপজ্জনক। ভয়াবহ প্যাথোজেন (জীবাণু) তৈরির আগে ভবিষ্যতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া থেকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও নিয়ে রাখা আবশ্যক।

সার্স-কোভ-২ ভাইরাস গবেষণাগার, নাকি বাদুড় থেকে অন্য কোনো প্রাণী হয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আসে নি বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। সম্প্রতি ২০১৫ সালের ঐ গবেষণায় অংশগ্রহণকারী বিজ্ঞানী র‍্যালফ ব্যারিক এক খোলা চিঠিতে বলেছেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য না আসছে, ততক্ষণ তাঁদের ২টি সম্ভাবনাকেই আমলে নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক মার্ক লিপসিচ এফটিকে বলেছেন যে যেসব গবেষণার কারণে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে, জনস্বাস্থ্যে এর প্রভাব বিবেচনায় পর্যাপ্ত যুক্তি ছাড়া তা হাতে নেওয়াই উচিত নয়।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ডব্লিউএইচও একটি তদন্ত চালিয়েছে। ঐ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে কোনো গবেষণাগার থেকে সার্স-কোভ-২ ছড়ানোর সম্ভাবনা কম। তবে ঐ তদন্তের ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এমনকি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস অ্যাদহ্যানম গেব্রেইসুস বলেছেন যে এই তদন্তকে পর্যাপ্ত বলা যায় না।

সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটি আদৌ গবেষণাগারে ছড়িয়েছে কিনা, সে বিষয়ে তদন্ত চালিয়ে দেখতে জো বাইডেন গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা হচ্ছে, ৯০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে যে এই ভাইরাস গবেষণাগার থেকে ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। একই সাথে এমন ধারণাকেও ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ’ (এনআইএইচ) বেশ বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। ‘ইকোহেলথ অ্যালায়েন্স’ নামে বেসরকারি একটি সংস্থার মাধ্যমে উহানের ল্যাবে পরিচালিত গবেষণায় এনআইএইচ অর্থায়ন করেছিল। ফাউসির মতো সংস্থাটিও দাবি করছে যে উহানে এর গবেষণা কার্যক্রমে গেইন অব ফাংশনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। মানুষের মধ্যে অতিমাত্রায় সংক্রামক কোনো প্যাথোজেন তৈরি করাও এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল না।

এনআইএইচের অর্থায়নে উহানে পরিচালিত এই গবেষণার সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু এখনও গোপনীয়। এমন গবেষণা করতে যাওয়াই উচিত হয় নি বলে মনে করছেন নিউ জার্সিভিত্তিক ‘রুটগার্স ইউনিভার্সিটি’ এর কেমিক্যাল বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক রিচার্ড এব্রাইট। তাঁর ভাষ্যমতে, করোনা মহামারী গবেষণাগার থেকে ছড়াক বা না ছড়াক, এমন গবেষণায় অর্থায়ন বা সহযোগিতা কোনোটিই করতে যাওয়া উচিত নয়।

এছাড়াও তিনি উহানের গবেষণাগারের নিরাপত্তামান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে শি ঝেংলি ও ইকোহেলথের পরিচালক পিটার দাসজাক ২০১৬ সালেও উহানের ‘বায়োসেফটি লেভেল-২’ (বিএসএল-২) গবেষণাগারে জীবন্ত করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। এনআইএইচের অর্থায়নে পরিচালিত ঐ গবেষণার জন্য বিএসএল-২ গবেষণাগার যথেষ্ট ছিল না। এর কারণ হচ্ছে, মূলত তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়বস্তু নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এসব ল্যাব ব্যবহার করা হয়। এসব গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা সাধারণত শুধু ল্যাব কোট ও গ্লাভস পরেই তাঁদের গবেষণা কার্যক্রম চালান।

রিচার্ড এব্রাইট বলেছেন যে যদি এই কাজ করতেই হয়, তবে তা অবশ্যই কোনো বিএসএল-২তে চালানোর মতো না। এর সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সাধারণ একটি ডেন্টিস্টের অফিসের সাথে তুলনা করা যায়।

বর্তমানে চীনের সবচেয়ে বিপজ্জনক জৈব গবেষণা কার্যক্রমগুলো ‘বায়োসেফটি লেভেল-৪’ (বিএসএল-৪) গবেষণাগারে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৮ সালে উহানে প্রথম বিএসএল-৪ ল্যাব চালু হয়েছে। বিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন যে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি যেভাবেই হোক, এই মহামারীর অন্যতম বড় শিক্ষা হচ্ছে গেইন অব ফাংশন সংক্রান্ত গবেষণাগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here