চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার সুবিধা ও অসুবিধা

0
16
চাকরি উদ্যোক্তা

অনেক মানুষই এখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তাঁদের মা-বাবারাও এ ব্যাপারে উৎসাহ দেন অথবা মেনে নেন। কিন্তু আজ থেকে ১০ বা ১৫ বছর আগে কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল না। উদ্যোক্তা জীবনের সংগ্রাম একটুও কমে নি, বন্ধুর পথ মসৃণ হয় নি, বরং করোনা মহামারী অনেক উদ্যোক্তার জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। অনেকে তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। কারণ এসব নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘সেফটি নেট’ বলে কিছু নেই। তাঁদেরও ‘সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স’ বলে কিছু থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের সহায়-সম্বল যা আছে তা-ই নিয়ে তাঁরা শুরু করেন। তাই কোনো অঘটন ঘটলে তাঁরা আর উঠে দাঁড়াতে পারেন না।

প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোক্তা হওয়ার আগে কি কিছুদিন চাকরি করা উচিত? এ ব্যাপারে অনেক মানুষের অনেক মত। তবে কোনোটাই পুরোপুরিভাবে ভালো বা খারাপ নয়। ২টিতেই কিছু সুবিধা ও কিছু অসুবিধা আছে। এখন দেখা যাক কিছুদিন চাকরি করে উদ্যোগ শুরু করার কিছু সুবিধা ও অসুবিধা।

সুবিধা

নিয়মকানুন শেখাঃ
উদ্যোক্তা হওয়ার আগে অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার বড় সুবিধা হলো, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান কিছু নিয়মকানুনের ভিত্তিতে গড়ে উঠে। প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠান মানে ইট-কাঠের ঘর-দুয়ার বা কিছু মানুষের সমাগম নয়; সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান, নিয়ম-নীতি (যেমনঃ আর্থিক নীতি বা মানবসম্পদ নীতিমালা), সাংগঠনিক কাঠামো ইত্যাদি। একজন কর্মী সেই সব নীতি দেখার এবং তার উপকার বা অপকার উপলব্ধি করার সুযোগ পান। তবে কোনো নীতিই সম্পূর্ণ নির্ভুল বা ত্রুটিমুক্ত নয়। তাই তিনি চাকরীকৃত প্রতিষ্ঠানের আলোকে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের নীতি তৈরি করতে পারেন।

শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনঃ
একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হলে বেশ কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। যেমনঃ অফিসে উপস্থিতির সময়, কাজ শেষের সময়, তত্ত্বাবধায়কের আদেশ-নির্দেশ মান্য করা, পোশাক-আশাকে শালীনতা বজায় রাখা ইত্যাদি। এ শৃঙ্খলা একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম। তবে যে প্রতিষ্ঠানের যেমন নিয়ম, তেমন মেনে চলতে হয়। যেমনঃ ব্যাংক বা এনবিএফআইয়ে খুব ফরমাল পোশাক-আশাক (ছেলেদের ক্ষেত্রে স্যুট, টাই, ফরমাল শার্ট ইত্যাদি) পরতে হয়। আবার গ্রাহকসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সেবার মান নির্ধারণ করে। এসব নিয়ম-শৃঙ্খলা একজন উদ্যোক্তাকে ভালোভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে শেখায়। উপদেশ বা আদেশ-নির্দেশ দিয়ে কোনো কিছু করানোর চেয়ে নিজে নিজে শেখাই বেশ সহজ।

পারস্পরিক যোগাযোগঃ
অফিসে ঊর্ধ্বতন, অধস্তন ও সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে হয়। সেখানে কাজ করতে গেলে মনোমালিন্য হয় এবং নিজেদেরই সেটা সমাধান করে এগিয়ে যেতে হয়। অফিসে ভিতরে ভিতরে ‘রাজনীতি’ চলে, কাজের চাপ, টার্গেটের চাপ থাকে – এসব পেরিয়ে অফিসে কাজ করতে হয়। অধস্তনদেরকে প্রণোদনা দিয়ে তাঁদের কাজ আদায় করতে হয়। অন্য ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে খাতির রাখতে হয় নিজের কাজের স্বার্থে। এসব জ্ঞান কোনো বই-পুস্তকে পাওয়া যায় না, স্কুলে পড়ায় না। অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন বাধায় পড়ে পড়ে শিখতে হয়। উদ্যোক্তা হলেন নিজের অফিসের বড় কর্তা। তিনি অনেক ক্ষেত্রে অন্য কর্মীদের সাথে খোলামেলাভাবে মিশতে পারেন না। তাঁকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়। তাছাড়া মালিক হিসেবে তাঁর সাথে বিতর্ক করার কেউ থাকে না। সুতরাং অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত কেউ ধরিয়ে দিতে পারে না। আমাদের চাকরির সংস্কৃতিতে এসব আরও কঠিন। তাই অন্য যে কোনো অফিসে চাকরি করে তিনি ব্যক্তি যোগাযোগে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।

জনসম্পদ ব্যবস্থাপনাঃ
অধিকাংশ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের হাতে জনসম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে এ কাজের জন্য আলাদাভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যায় না, কারণ এতে ব্যয় সংকুলান হয় না। কোম্পানি বড় হলে ধীরে ধীরে জনসম্পদ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া যায়। কোম্পানি আরও বড় হলে আলাদা বিভাগও খোলার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তারপরেও জনসম্পদবিষয়ক শেষ বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তা বা মালিকের হাতেই থাকে। কেউ কোনো কোম্পানিতে চাকরি করলে কমপক্ষে একজন কর্মী হিসেবে জনসম্পদবিষয়ক নীতি, বিধিবিধান ইত্যাদি জানার সুযোগ থাকে।

দক্ষতা অর্জনঃ
কাজ করতে করতে হাত পাকা করতে হয়। কাজ করতে গেলে ভুল হয়, আবার সেই ভুল শুধরাতেও হয়। ইতিবাচক-নেতিবাচক ব্যাপারগুলো দেখার ও বোঝার সুযোগ হয়। উদ্যোক্তা অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে অন্যের খরচে ভুল করে ও ঠেকে কাজ শিখে নিতে পারেন। আর নাহলে নিজের প্রতিষ্ঠানে ভুল করে করে তাঁকে শিখতে হবে। এর ফলে শুধু ব্যয় নয়, সময়ও নষ্ট হয় বা হতে পারে।

বাজার যাচাইঃ
যে কোনো ব্যবসার ক্ষেত্রেই ‘বাজার’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। পণ্য যতই আকর্ষণীয় বা ভালো মানের হোক না কেন, কাঙ্ক্ষিত দামে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকলে সেই ব্যবসা সফল হবে না। কোনো উদ্যোক্তা যদি একই ধরনের বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিছুদিন চাকরি করেন, তাহলে বাজার সম্পর্কে তিনি একটি ধারণা পাবেন। ‘ফিলিপ কর্টলার’ এর বিপণন মিশ্রণের ৭পি অনুসারে পণ্য, দাম, প্রচার, স্থান, মানুষ, পদ্ধতি ও বাস্তবিক প্রমাণ – এর কোনো একটি উপাদান দুর্বল বা মানানসই না হলে উদ্যোক্তার পক্ষে বাজারে প্রবেশ, প্রসার বা টিকে থাকা দুরূহ হতে পারে। বিপণনের এসব প্রাথমিক জ্ঞান চাকরিকালে অর্জন করে নিলে উদ্যোক্তা পর্যায়ের জীবন অনেক ঝামেলামুক্ত হবে।

নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাঃ
জোরদার নেটওয়ার্ক ব্যবসায় অনেক বড় সহায়ক। উদ্যোক্তাকে ক্রেতা বা সম্ভাব্য ক্রেতা ছাড়াও জোগানদার, দক্ষ জনশক্তি, অর্থায়নকারী, সরকারি কোম্পানি বা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বা বজায় রাখতে হয়। নতুন করে এদের সবার সঙ্গে সম্পর্ক করতে গেলে অনেক সময় লাগতে পারে। একই ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে পরবর্তী সময়ে তিনি অনেক সহজেই কাজ শুরু করতে বা চালিয়ে যেতে পারবেন।

অসুবিধা

কমফোর্ট জোনে প্রবেশঃ
চাকরি করার সূত্রে মাস শেষে বেতন পাওয়া যায়। উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। অনেক উদ্যোক্তা সেই পর্যায়ে কোনো বেতনই নেন না বা খুব অল্প পরিমাণে টাকা নেন। ব্যবসা পরিপূর্ণভাবে শুরু হলে বিক্রয় থেকে টাকা আসবে, যা থেকে খরচ মিটিয়ে পরবর্তী সাইকেলের জন্য টাকা রেখে নিজে কিছু হাতখরচ নেওয়া যেতে পারে। সংসার বা জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হলে অনেক উদ্যোক্তার জন্য কষ্টদায়ক হয়ে উঠে, বেশিদিন উৎসাহ ধরে রাখতে পারেন না। মাস শেষে বেতন পাওয়ার নিশ্চিন্ত জীবন তাঁদের স্মৃতিতে ভেসে উঠে। ভাবেন যে ভুল করলেন কি না।

পারিবারিক প্রত্যাশা তৈরি হওয়াঃ
অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁর কর্মীদেরকে গাড়ি দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়ি করার বা গাড়ি কেনার ঋণ দেয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বছরে ২টি উৎসব বোনাস পাওয়া যায়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষতা বোনাস দেয়, যা বলতে গেলে বিরাট অংকের টাকা। অনেক প্রতিষ্ঠানে ‘লিভ ফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স’ বা ছুটি উপভোগ করার জন্য আর্থিক ভাতা পাওয়া যায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই দেশ বা বিদেশে বেড়াতে যান। নিজে উদ্যোক্তা হলে এসব বিলাসিতা করা যায় না। পরিবার তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আশাহত হয়। বড়জোর দু-এক বছর ধৈর্য ধরে। তারপর হয়তো মুখ ফুটে বলেই ফেলতে পারে যে নিজের ব্যবসা করে লাভ কী হলো, আগের চেয়ে তো অবস্থা এখন খারাপ।

সামাজিক অবস্থানঃ
চাকরি এদেশে শুধু আর্থিক নিরাপত্তা নয়, ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ও বটে। পরিচয় হলো এর প্রধান উপাদান। তখন পরিচয় দেওয়া যায় যে কেউ অমুক প্রতিষ্ঠানের অমুক পদে আছেন। ছেলেমেয়েরা পরিচয় দেয় যে তার / তাদের বাবা অমুক ব্যাংকের বা তমুক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজার। উদ্যোক্তার নিজের নতুন ব্যবসার অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের নাম শুনে সবাই ভ্রূ কুঁচকে তাকায়। অনেকে স্ত্রীকে মুখের ওপর বলে দেন যে তাঁর স্বামীর কি চাকরি চলে গেছে। অনেক উদ্যোক্তা চাকরি শুরু করার পর এই ‘স্ট্যাটাস’ বা আইডেন্টিটি ট্র্যাপে পড়ে যান, আর বের হতে পারেন না।

জীবনযাত্রাঃ
চাকরির মাসিক বেতন একটা নির্দিষ্ট জীবনমান গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ব্যবসা করার সময় কোনো মাসে টাকা উপার্জন না হলে সেই জীবনযাত্রা বজায় রাখা কষ্টকর। যেমনঃ আগের মতো গাড়ির খরচ বহন করা, ড্রাইভার রাখা, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন দেওয়া ইত্যাদি।

ইগো তৈরি হওয়াঃ
কেউ একজন একটি ব্যাংকে চাকরি করার সময় তাঁর এক সহকর্মী কোনো একদিন রিকশায় করে অফিসে এসেছিলেন। ঐ সহকর্মী একটা বিভাগের প্রধান ছিলেন। তার মানে বেশ উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তা। প্রধান নির্বাহী ব্যাংকের সম্মানহানির জন্য তাঁকে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ১৮-১৯ জন সিনিয়র, জুনিয়র সহকর্মীর সামনে খুব বকাঝকা করলেন। এই রকম জীবনধারা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। একজন উদ্যোক্তার জন্য এগুলো বিরাট বদভ্যাস। প্রয়াত আনিসুল হক এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন যে তাঁর প্রথম উদ্যোগ টাঙ্গাইল থেকে পাট কিনে চট্টগ্রামে সরবরাহ করার সময় তিনি ট্রাক ড্রাইভারের পাশে বসে ভ্রমণ করেছিলেন। অনেক উদ্যোক্তা প্রথম জীবনে কায়িক পরিশ্রমও করেছেন। আসলে চাকরি একটা ভ্রান্ত ইগো তৈরি করে। এ ইগো তৈরি হওয়ার আগেই চাকরি জীবন থেকে বের হয়ে আসা উচিত।

সরাসরি উদ্যোক্তা, নাকি কিছুদিন চাকরি করে উদ্যোক্তা হওয়া ভালো, তার কোনো সোজাসাপ্টা উত্তর নেই। অনেক উদ্যোক্তাই সরাসরি ব্যবসায় নেমে পড়েছেন আবার অনেকে কিছুদিন চাকরি করে নেমেছেন। তবে চাকরি করলেও সেক্ষেত্রে বেশিদিন করা উচিত নয়। তাতে পরিবারের প্রত্যাশা বেড়ে যায়, নিজের ইগো বাড়ে, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসেও কমফোর্ট জোনে ঢুকে যাওয়ার ভয় থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here