জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনলাইন ব্যবসা

0
13
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনলাইনে ব্যবসা

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সবচেয়ে বেশী উন্নত হচ্ছে প্রযুক্তি খাতে। বর্তমান সময়ে প্রায় সব কিছুই ডিজিটাল উপায়ে হচ্ছে।তারই সূত্র ধরে, কমার্স কিংবা এফকর্মাস অনলাইনে কেনাকাটার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনলাইন ব্যবসা  । 

করোনা মহামারীর প্রকোপের ফলে মানুষ অন লাইন কেনা কাটার উপর অনেক নির্ভরশীল হয়ে গেছে।যার ফলে এই প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রাহকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে। এখন যে কোন সময়ে,সবাই ঘরে কিংবা অফিসে বসে প্রয়োজনীয় পণ্য অর্ডার করেন এবং ঘরে বসেই তা হাতে পেয়ে যান। এই কাজের জন্য কমার্সের প্রসারের সাথে সাথে পণ্য ডেলিভারি করার অর্থাৎ লজিস্টিক সার্ভিসগুলোও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। 

কমার্সের সম্পূর্ণ কাজই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইন্টারনেট ব্যবহার করে ক্রয়বিক্রয়, আর্থিক লেনদেন তথ্য আদান প্রদান করা হয়, যা কমার্স বা ডিজিটাল বানিজ্যের মূলভিত্তি। ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত হয় ওয়েবসাইট, ইমেইল সহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক মাধ্যম। কমার্স বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত যেমনব্যবসা প্রতিষ্ঠান টু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (বিটুবি), ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টু ভোক্তা (বিটুসি), ভোক্তা টু ভোক্তা (সিটুসি) এর মধ্যেই বেশি হয়ে থাকে। এছাড়াও সরকারের সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ভোক্তার সাথে সরকারের কিছু ব্যবসা কার্যক্রম কমার্সের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। 

এর পাশাপাশি বর্তমানে এফকমার্সও বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের অনেকেই এবং এফকমার্সের পার্থক্য বুঝতে না পেরে এফকমার্সকে কমার্স বলে থাকেন। এফকমার্স মূলত কমার্সের একটি অংশ। তবে অংশ হলেও এর আলাদা আবেদন তৈরি হয়েছে। এফকমার্স ব্যাপারটি তুলনামূলক নতুন হওয়ায় আমাদের অনেকেরই মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কমার্স বলতে আমরা বুঝি ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করা। এখানে কমার্সের সাথে সব ধরনের ইলেকট্রনিক মাধ্যমকেই সম্পৃক্ত বলে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুক এর মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসাকে আলাদা নামে অর্থাৎ ফেসবুক কমার্স বা এফকমার্স নামে অভিহিত করা হয়েছে। 

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িকভাবে দারুণ লাভবান হচ্ছে। পণ্য, সেবা এবং বিশ্বস্ততা তাদের এই সাফল্যের দিকে ধাবিত করছে। যেহেতু অনলাইনে পণ্যের সঠিক অবস্থা না দেখেই পণ্য কেনাকাটা করেন তাই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সততার সাথে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। তা না হলে গ্রাহক আস্থা হারিয়ে ফেলবেন এবং ভবিষ্যতে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে আর পণ্য কিনবেন না। আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লাভের কথা চিন্তা করতে গিয়ে পণ্যের উৎপাদন বা সংগ্রহ করার দিকে বিশেষভাবে মনযোগী হতে হয়। কারণ ক্রয়মূল্য বা উৎপাদন মূল্য বেশি হলে তাকে সেই পণ্য অধিক দামে বিক্রি করতে হবে। কমার্সে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি হওয়ায় পণ্যের দাম অধিক হলে কেউ পণ্য কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করবেন না। তাই সবদিক বিবেচনায় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিশ্বব্যাপী কমার্স অনেক জনপ্রিয় ব্যবসার মাধ্যম। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনলাইন ব্যবসা 

নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করে তারা আন্তর্জাতিক বাজারেও সফল ভাবে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছে।তার মধ্যে আমাজন, আলিবাবা, বে, জিংডং, জালান্ডো, ফ্লিপকার্ট, ওয়ালমার্ট ইত্যাদি অন্যতম। এদের মধ্যে আমাজন,ফ্লিপকার্ট আলিবাবা বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয়।শুধু যে বাইরের কমার্সগুলোই বাংলাদেশে জনপ্রিয় তা কিন্তু নয়।বর্তমানে বাংলাদেশী কিছু কমার্স প্ল্যাটফর্মও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং সারা দেশে ব্যবসা পরিচালনা করেছে। বাংলাদেশী যেসব কমার্স প্ল্যাটফর্ম বেশ আলোচনায় রয়েছে তাদের মধ্যে দারাজ, রকমারি.কম, ইভ্যালি, চালডাল.কম, বিক্রয়.কম, প্রিয়শপ.কম, অথবা.কম ,পিকাবো ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশী প্ল্যাটফর্মগুলো যদিও এখনো বিশ্বমানের সেবা দিতে সক্ষম নয়। তবুও এদের জনপ্রিয়তা ঈর্ষনীয়। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, অনলাইনে বই কেনার ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা অনেক বেশি। এর কারণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেসব বই লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়না সেগুলো কমার্সের সাইটে পাওয়া যায়। কিংবা কোন লেখকের বই প্রিঅর্ডার সাপেক্ষে সবার আগে পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

বর্তমানে এফকমার্স নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। কারণ তরুণ প্রজন্মের শতকরা ৮০ভাগেরও বেশি এখন ফেসবুকের সাথে যুক্ত থাকায় ফেসবুকে ব্যবসা বা এফকমার্স বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবার ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করা কমার্সের তুলনায় আরো সহজ। কারণ, এখানে আলাদা করে ওয়েবসাইট ম্যানেজ করে নতুন লোকদের সাথে ব্যবসা স্থাপনের প্রয়োজন হয় না। ফেসবুক পেইজ এবং গ্রুপের মাধ্যমেই ব্যবসা পরিচালনা করা যায়। ফলে ব্যবসা পরিচালনা করতে খরচ কম হয়।এজন্য তরুণ উদ্যোক্তা বিশেষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে এফকমার্স বেশ জনপ্রিয় এক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আর সংখ্যা প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও আছে।অতিরিক্ত প্রতিদ্বন্দিতার কারণে, সঠিক উপায়ে দক্ষতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পেরে অনেকেই ব্যবসা থেকে ছিটকে যাচ্ছেন। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনলাইন ব্যবসা । 

তাই কমার্স কিংবা এফকমার্স ব্যবসা করতে হলে আগে সঠিক পদ্ধতি জেনে তা অনুসরণ করতে হবে। এফকমার্স এর যাত্রা অনেক আগে থেকে হলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে ২০১২ সালের পর থেকে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সাল থেকে এর বাজারে এক ধরনের বিস্ফোরণ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪০মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই ২০ মিলিয়ন। ফলে বড় একটা বাজার তৈরি হয়েছে এই ফেসবুককে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন সূত্রমতে , প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার বাজার এই ফেসবুক। যেখানে রয়েছে লাখেরও অধিক দোকান। এদের মধ্যে কিছু ব্যবসা সারাবছর চলে, কিছু রয়েছে সাময়িক। যেমন প্রায় ৫০০ উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা গ্রীষ্মকালে আম নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। ২০০ পেইজ থেকে ইলিশ মাছ বিক্রি করা হয়। তবে এই পরিসংখ্যানকে এখন শতভাগ জোর দিয়ে সঠিক বলা যাচ্ছে না। এর কারণ, করোনাকালে এফকমার্সের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, শুধুমাত্র করোনাকালেই কয়েক লাখ নতুন এফকমার্স পরিচালনাকারী তৈরি হয়েছে।  জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনলাইন ব্যবসা । 

এফকমার্সে নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবে বাজারে হয়তো নারীরা ব্যবসা পরিচালনা করতে আগ্রহী হয়না কিন্তু অনলাইনে ঘরে বসে সহজে ব্যবসা করা যায় বলে অনলাইন ব্যবসায় তাদের উপস্থিতি বেশ সরব। প্রায় ৬০ ভাগ অনলাইন ব্যবসার কর্ণধার নারী। তাদের নিজেদের তৈরি হ্যান্ডমেড জিনিসপত্র, হোমমেড খাবার, কাস্টমাইজ কেক, কাস্টমাইজ পোষাক, হ্যান্ডক্রাফট ইত্যাদি ক্রেতাদের বেশ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হচ্ছে। কমার্স কিংবা এফকমার্স জনপ্রিয় হবার পিছনে তাদের কিছু স্পেশাল বিজনেস পলিসি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন, চলমান অফলাইন বাজার থেকে কম দামে পণ্য সরবরাহ করা, গ্রাহকদের হোম ডেলিভারি সুবিধা প্রদান করা, বিভিন্ন প্রমোশনাল অফার ডিসকাউন্ট প্রদান করা, ক্যাশ অন ডেলিভারি সার্ভিসসহ আরও নানা উপায়ে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। ভোক্তাদের অনলাইন কেনাকাটায় আগ্রহী হবার পেছনে হোম ডেলিভারি এবং ক্যাশ অন ডেলিভারি সার্ভিস দুটি বিশেষভাবে ভূমিকা  রাখছে। এতে ক্রেতার আস্থা অর্জন সহজ হয়, অগ্রিম টাকা দিয়ে পণ্যের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয়না। তবে এই ডেলিভারি নিয়েও অনেকের অভিযোগ রয়েছে যেমন সময়মতো পণ্য হাতে না আসা বা ডেলিভারির সময়ে পণ্য নষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যদিও এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিক্রেতার দোষ থাকেনা, ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার জন্য এরকম হয়ে থাকে। অনলাইনে যে পণ্যগুলো সবচেয়ে বেশি ক্রেতাদের আকর্ষণ করে তার মধ্যে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, পোষাক, ঐতিহ্যবাহী পণ্য, বিদেশী প্রসাধনী কসমেটিকস, সিজনাল ফল, ইলিশ মাছ, শুটকি ইত্যাদি। 

বর্তমানে ছাই থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছেন নতুন উদ্যোক্তারা। যারা সময়ের স্বল্পতার জন্য ছোট মাছ কাটতে পারে না, সবজি সঠিক সাইজে কাটতে পারে না তাদের জন্য চালু হয়েছে রেডি টু কুক নামের এক ধরনের উদ্যোগ। যেখানে মাছ কেটে, ধুয়ে, পরিষ্কার করে রান্নার উপযোগী করে ডেলিভারি দেয়া হয়। বলতে গেলে জীবনযাপন সহজ ঝামেলামুক্ত করতে যত ধরনের পণ্য সেবা প্রয়োজন তার সবই এখন অনলাইন বিজনেসের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা প্রদান করে যাচ্ছেন।

 কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইক্যাব) বাংলাদেশে কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ নিয়ে কাজ করলেও এফকমার্সের জন্য এরকম স্বীকৃত কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। তবে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, নারীদের এফকমার্সে সংযুক্ত করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করছে উইমেন ইন কমার্স (উই), নিজের বলার মত একটি গল্পসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এছাড়া অঞ্চলভেদে উদ্যোক্তারা নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় কমিউনিটি ফোরাম গড়ে তুলছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন বৈধতা নেই বলে মনে করছেন ব্যবসা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। তারা মনে করেন, অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনাকারী বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবসার সাথে জড়িত শতকরা ৮০ভাগেরও বেশি আইন না জেনে এবং না মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে তাদের মতে, বৈধভাবে ব্যবসা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ইতিবাচক এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সবাই একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ব্যবসা করতে আগ্রহী হবেন। সঠিক জ্ঞানের অভাবে এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় না আসার ফলে ছোট ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের উদ্যোগকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করলে এরাই একেকটি ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে। কমার্স নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারি মহলে কিছু আলোচনা এবং কিছু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলেও এফকমার্স নিয়ে চোখে পড়ার মত প্রশিক্ষণ চোখে পড়েনা। তাদেরকে যথাযথ প্রশিক্ষণ সচেতনতার আওতায় আনতে পারলে খাতটি আরো সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে এবং দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here