টমাস বাটা: শূন্য থেকে শীর্ষে

0
72
টমাস বাটা

পৃথিবীতে দু ধরনের মানুষ আছে। একদল প্রচুর পরিকল্পনা করে কিন্তু কাজ করে না। আরেকদল সঠিক পরিকল্পনা করে পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে। আবার আরেকটি কথা আছে, ধরুন আপনি একটি ব্যবসা বা স্টার্টআপ শুরু করলেন। কিন্তু আপনার চলার রাস্তা মসৃণ না হওয়ার কারণে আপনি মাঝ পথে হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু হাল ছাড়ার আগে এমন একজন এর গল্প শুনুন, যিনি সফলতার জন্য পাড়ি দিয়েছেন পর্বতসম দুর্গম পথ।

১৮৭৬ সালের ৩ এপ্রিল। চেক-প্রজাতন্ত্রের ( তৎকালীন অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরী সাম্রাজ্য) জেলিন শহরে জন্মানো এক শিশুর নামই ছড়িয়েছে পুরো বিশ্বে। মাত্র ১০ বছর বয়সেই মাতৃহারা এই মানুষটির হাত ধরেই তৈরি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা জুতার ব্র্যান্ড।এমন এক ব্র্যান্ড, এক সময় যা জুতা শব্দের সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। নাম তার বাটা। আমাদের দেশে বাটা জুতা জীবনে কখনো পড়েননি এমন লোক খুব কমই পাওয়া যাবে। এতো সফল এই জুতার ব্র্যান্ড এর সফলতার কাহিনী কিন্তু এত সহজ ছিল না। গল্পের শুরুটা হয় টমাস বাটার হাত ধরে। যিনি পেশায় ছিলেন একজন মুচি বা চর্মকার। ছোট পরিসরে শুরু করলেও পরিশ্রম ও অধ্যবসায়, একে পরিণত করে পুরো বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটওয়্যার ব্র্যান্ড।

বাটার শুরুটা হয় ১৮৯৪ সালের ২৬ আগস্ট। যখন টমাস বাটা তার ভাই এন্টোনিন ও বোন এনার সাথে মিলে মাত্র ১০ জন কর্মচারী নিয়ে জেলিন শহরে জুতা বানানোর ব্যবসা শুরু করেন। তাদের পুজি ছিল ৮০০ অস্ট্রিয়ান গাল্ডেন ( যা তৎকালীন ৩২০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ছিল)। কোম্পানীর নাম দেন টি এন্ড এ বাটা শু কোম্পানী (T & A Bata Shoe Company)। জুতার কোম্পানীটি নতুন হলেও জুতা তৈরিতে তারা কিন্তু নতুন ছিলেন না। বরং তাদের আট প্রজন্ম ৩০০ বছর ধরে এই কাজটি করে আসছিল।তবে টমাসই তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যে জুতো বানানোর কাজটিকে কোম্পানিভিত্তিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করেছিলেন।

কিন্তু নতুন ব্যবসা শুরু করলে যেমন নানা সমস্যা আসে, ঠিক তেমনি বাটা শু কোম্পানীও নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। প্রথম সমস্যাটি ছিল চামড়ার জুতো তৈরিতে খরচের পরিমাণ অনেক বেশী হওয়ায়, কোম্পানী শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায়ই বাটা প্রচুর ঋনগ্রস্ত হয়ে যান। অন্য কেউ হলে হার মেনে ব্যবসা গুটিয়ে নিতো। কিন্তু টমাস বাটা ছিলেন অন্য ধাতে গড়া।

এ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেন টমাস। শুরু করেন ক্যানভাস দিয়ে জুতো তৈরি,যেই ধারনা থেকে আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল জুতোতেই ক্যানভাস ব্যবহার করা হয়। চামড়ার জুতার তুলনায় ক্যানভাসের জুতা অনেক কমমূল্যে বিক্রি করার ফলে আবার ঘুরে দাঁড়ায় বাটা কোম্পানী।এর জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে ১৯০৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কিভাবে অনেক বেশী পরিমাণ জুতা একসাথে উৎপাদন করা যায় তা শিখে আসেন এবং এ পদ্ধটিতি এখানে প্রয়োগ করে বাটার ব্যবসার পরিধি আরো বাড়ান।

কিন্তু ১৯০৮ সালে আবারো বাধা আসে যখন তার ভাই এন্টোনিন বাটা টিউবারকোলোসিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু বাটা থেমে যাননি। তিনি তার ছোট ভাইদেরকে ব্যবসায় অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ব্যবসা চালিয়ে যান। ১৯১২ সালের মধ্যে বাটার পরিধি অনেক বাড়ে এবং এর কর্মচারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০০ তে।

১৯১৪ সালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ,যেখানে যুদ্ধের সময় অন্যান্য ব্যবসা থমকে দাঁড়িয়েছিল,সেখানে বাটার জন্য তা হয়ে এসেছিল আশীর্বাদ হিসেবে। কমদামে ভালোমানের জুতা তৈরির জন্য পরিচিতি পাওয়া বাটা শু কোম্পানী পেল মিলিটারী জুতা তৈরি করার বিশাল অর্ডার। ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এ যুদ্ধের মিলিটারী জুতা সময়মতো তৈরি করতে গিয়ে বাটাকে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হয় ১০ গুণ।

আর এরই মধ্যে ইউরোপের নানা শহরে বাটা শু স্টোরও খোলা হয়। ফলে ব্যবসার বৃদ্ধি হয় অনেকগুণ। তবে সারাজীবন বাধাবিপত্তি পার করে আসা টমাসের চলার পথ কখনোওই মসৃণ ছিল না। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ব্যবসার পরিধি অনেক বাড়লেও যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়ে বাটাও। কিন্তু হার না মানা মানসিকতার টমাস এবারও বাজিমাত করলেন নিজের সিদ্ধান্ত দিয়ে।

তিনি বাটার সকল স্টোরে বাটা জুতার উপর ৫০% মূল্যছাড় দিলেন। অর্থাৎ অর্ধেক দামে জুতা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর এ সিদ্ধান্তের পিছনে কর্মীদের বিশাল অবদান আছে, তারা সবাই ৪০% কম বেতনে কাজ করার জন্য রাজি ছিল। আসলে আপনি একটি ভালো টিম ছাড়া কখনোই ব্যবসা আগাতে পারবেন না, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হল এ ঘটনাটি। মূল কথায় আসা যাক, ৫০% ছাড়ের জুতোর জন্য প্রচুর অর্ডার আসতে লাগলো বাটার কাছে। ফলে মন্দায় অন্যান্য কোম্পানীগুলো যখন বন্ধ হওয়ার যোগাঢ় তখন বাটা তরতর করে সফলতার সিড়ি বেয়ে উঠছিল। আর টমাস বাটাকেও এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আস্তে আস্তে বাটা পুরো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জুতার ব্র্যান্ড এ পরিণত হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বের ৭৩ টি শহরে বাটার প্রায় ৫৩০০ স্টোর আছে।যা থেকে বাটার ব্যবসার পরিধি বুঝা যায়। বাটার মূল সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত। আর এই সুইজারল্যান্ড এর মোহলিন শহরে একটি বিজনেস ট্রিপে যাওয়ার সময় ১৯৩২ সালের ১২ জুলাই এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান টমাস বাটা।

টমাস বাটা চলে গেলেও একটি শিক্ষা তিনি আমাদের সবাইকে দিয়ে যান, বাধা বিপত্তি আসলে হাল ছেড়ে দিলে আপনি কখনো সফল হতে পারবেন না, বরং কঠোর পরিশ্রম আর নিয়মানুবর্তী হয়ে বাধাকে জয় করে সামনের দিকে এগুলেই সাফল্য আপনার হাতে এসে ধরা দিবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here