করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলার হারাতে পারে শিক্ষার্থীরা

0
7
করোনা শিক্ষা

করোনা মহামারী আঘাত হানার পরে বিশ্ব স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বছরজুড়ে বন্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইনে কিছু শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সমান ছিল না। মহামারীতে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা ও আয়কে অনেক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ‘এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক’ (এডিবি) বলেছে যে উন্নয়নশীল এশিয়ার জন্য শিশুদের এই হারানো আয়ের বর্তমান মূল্য ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১ কোটি ৫ লক্ষ ৯৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা)।

বুধবারে (২৮শে এপ্রিল) প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ নামক এক প্রতিবেদনে এডিবি জানিয়েছে যে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এ অঞ্চলের শিশুরা শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩ ভাগের ১ ভাগ হারিয়েছে। এজন্য তাদের ভবিষ্যতের উপার্জন ২.৪% কিংবা বছরে ১৮০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৫২৫৯ টাকা) করে কমে যেতে পারে। আয়ের এমন ক্ষতি এই অঞ্চলের ২০২০ সালের উৎপাদনের ৫.৪% এর সমান।

অল্প কিছু বৃহৎ অর্থনীতি বিদ্যালয়গুলো অবিচ্ছিন্নভাবে চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে। এডিবি জানিয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল। শিক্ষার্থীরা বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার শিক্ষার্থীরা বছরের ৩৯% এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষার্থীরা বছরের ৩৫% সময় বলতে গেলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে ছিল।

মহামারীর শুরুতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়েই শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও তীব্র বৈষম্য দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশের ও শহুরে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সুযোগ পেলেও অনুন্নত দেশ এবং গ্রামের শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট সেবার বাইরে থাকায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ম্যানিলাভিত্তিক ঋণদানকারী এই সংস্থা বলেছে যে অনেক শিক্ষার্থী কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মতো বিষয়গুলো ব্যবহারে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে। এটি বাড়িতে থাকাকালীন তাদের শেখার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।

এদিকে শিশুদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে যে করোনা মহামারীজনিত লকডাউনের কারণে বিশ্বজুড়ে ১৬ কোটি ৮০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়গুলো সারা বছর বন্ধ ছিল। এর পাশাপাশি ২১ কোটি ৪০ লক্ষ শিক্ষার্থী ৪ ভাগের ৩ ভাগেরও বেশি বিদ্যালয়ের সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বিদ্যালয় বন্ধের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে ১৪টি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ আছে। দেশগুলোর ৩ ভাগের ২ ভাগই ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের। এর ফলে ৯ কোটি ৮০ লক্ষ শিক্ষার্থী প্রভাবিত হয়েছে। ১৪টি দেশের মধ্যে পানামায় বেশির ভাগ দিনগুলোতেই বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ছিল। এর পরেই আছে এল সালভাদর, বাংলাদেশ ও বলিভিয়া।

বিদ্যালয় বন্ধের বিষয়টি শিশুদের পড়াশোনা ও সুস্থতার ক্ষেত্রেও বেশ ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে। দূরবর্তী শিক্ষায় (রিমোট লার্নিং) অংশগ্রহণ করতে না পারা শিক্ষার্থীরা কখনও ক্লাসরুমে ফিরে না আসা এবং বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ইউনেস্কোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে ৮৮ কোটি ৮০ লক্ষেরও বেশি শিশুর পড়াশোনা বাধার সম্মুখীন হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে তারা তাদের সহপাঠীদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, সহায়তা চাইতে পারে, টিকাদান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারে। তাই যত বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকবে, তত বেশি সময় ধরে শিশুরা শৈশবকালীন এসব জটিল বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here