থমাস সাংকারা: অন্ধকার আফ্রিকার আলোকিত কিংবদন্তী

0
16
থমাস সাংকারা আফ্রিকার কিংবদন্তী

আফ্রিকা, যেন গোটা পৃথিবীর এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। পুরো পৃথিবী এক দিকে চললেও আফ্রিকা পুরো উলটো। পুরো আফ্রিকা যেন এক রহস্য। কখনো ফরাসি ঔপনিবেশিকতার কালো থাবায় জর্জরিত,কিংবা কখনো আবার মহামারীতে আক্রান্ত। এমনই একটি দেশ পশ্চিম আফ্রিকার বুরকিনা ফাঁসো। যা এক সময় ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিকতার অংশ।তবে অন্যান্য আফ্রিকান দেশের মতো এদেশের গল্প ছিলনা। কারণ এই দেশের বেশিরভাগ মাটি অনুর্বর। তবে স্বপ্নবাজরা অনুর্বর মাটিতেই সোনা ফলানোর স্বপ্ন দেখেন। বুরকিনা ফাসোতেও ছিল তেমন এক ক্ষণজন্মা কিংবদন্তী। নাম তার থমাস সাংকারা। তিনি এই দেশে সোনা ফলাতেও শুরু করেছিলেন। তবে আফ্রিকা বলে কথা, ভয়াল পিশাচের কালো থাবায় তাকে মাঝপথেই থেমে যেতে হয়, চলে যেতে হয় অকালে। ১৯৪৯ সালের ২১ ডিসেম্বর,তৎকালীন আপার ভল্টার (বর্তমান বুরকিনা ফাঁসো) ইয়াকোতে জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা নায়কের গল্পই লিখবো আজ। পড়ুন থমাস সাংকারা আফ্রিকার কিংবদন্তী ।

১৮৮৮ থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে ফরাসি কলোনিতে পরিণত হয় আপার ভল্টা (পরবর্তীতে বুরকিনা ফাসো) অনেক অত্যাচার নির্যাতন শেষে, ১৯৬০ সালের আগস্ট স্বাধীন হয় দেশটি। স্বাধীনতার পরেও পরিস্থিতি ঠিক হয় নি, নানা ঘাতপ্রতিঘাত আর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দিন চলে যায়।তার উপর মাঝে মধ্যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নড়বড়ে হতে থাকে। স্বাধীনতার ছয় বছর পর,১৯৬৬ সালে লে. কর্ণেল সাঙ্গোলি লামিজানা (পরবর্তীতে জেনারেল) এক সেনাঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তখনকার নির্বাচিত সরকার প্রধান মরিস ইয়ামোগোকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেন। ১৯৮০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন এই সেনাশাসক ।তবে শাসক হিসেবে মোটেও ভালো ছিলেন না তিনি। তার শাসনে (আসলে শোষণ) অতিষ্ঠ হয়ে সর্বশ্রেণীর মানুষের ক্ষোভ একসময় আন্দোলনে পরিণত হয়।মানুষ একের পর এক আন্দোলন করতে থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল সায়ে জেবোর লামিজানাকে হঠিয়ে ক্ষমতায় বসেন। তার শাসনকাল অবশ্য তেমন দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮২ সালের নভেম্বরে ননকমিশন্ড সেনা অফিসাররা আরেক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেবোরকে সরিয়ে মেজর জিনব্যাপটিস্ট ওয়েডেরোগোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে। তবে এর কিছুদিনের মধ্যেই দেশটি রাজনৈতিকভাবে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে আগের প্রেসিডেন্ট ওয়েডেরোগার পক্ষে থাকে, আরেকদল পরিবর্তনের সংকল্পে ন্যাশনাল রেভ্যলুশনারি কাউন্সিল গঠন করে। পরবর্তীতে তারা আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, আরেক সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন থমাস সাংকারাকে হেড অভ দ্য স্টেট ঘোষণা করে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। থমাস সাংকারা আফ্রিকার কিংবদন্তী ।

শুরু হয় নতুন এক যুগ,স্বপ্নবাজ সাংকারা ক্ষমতায় এসেই পরিবর্তনের ধারা শুরু করেন। প্রথমেই তিনি দেশের নাম পরিবর্তন করেন, যেটা আজকের বুরকিনা ফাসো, যার অর্থটাও চমৎকার,দুর্নীতিমুক্ত মানুষের দেশ। নাম পাল্টিয়েই বসে থাকেননি তিনি।দেশের কল্যাণে নিতে থাকেন নানা উদ্যোগ।তার নেওয়া উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিশুদের বিভিন্ন রোগের টিকাদান, নাগরিকদের জন্য গৃহায়ণ প্রকল্প, সাহেল অঞ্চলে (যেটি সাহারা মরুভূমির কাছাকাছি একটি বনাঞ্চলহীন স্যাঁতস্যাঁতে অঞ্চল) বৃক্ষায়ণ এবং নারী শিক্ষা সহ আরো অনেক উদ্যোগ।  থমাস সাংকারা আফ্রিকার কিংবদন্তী ।

সাংকারার বিশ্বাস ছিল,নিজস্ব সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহার বিদেশী সাহায্য বর্জন,বিদেশী উন্নয়ন মডেল বর্জন,নারী উন্নয়ন তাদেরকে উন্নয়নের অংশীদার করা; এবং সব শ্রেণীর মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ না করলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তিনি এও বুঝতে পারেন, নিজেদের শক্তিতে এগিয়ে যেতে হলে বিদেশী যত উন্নয়ন মডেল আছে সেগুলোকে বর্জন করতে হবে। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে উন্নয়নের যত মডেল দাঁড় করানো হয়েছিল, সবগুলোই ছিল বিদেশী এবং সবগুলোই ব্যর্থ হয়। তাই তিনি বিদেশী উন্নয়ন মডেল বাদ দিয়ে নিজেদের সম্পদ পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব উন্নয়ন মডেল দাঁড় করান।নিজেদের যা আছে সেটা নিয়েই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৮৩৮৭, তার শাসনামলের এই সময়ে বুরকিনা ফাসো কোনো বিদেশী সাহায্য, এমনকি বিশ্বব্যাংকের সাহায্যও নেয়নি। এই সময়ের মধ্যে দেশে পানির অভাব দূর করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী ২৫০টি খাল এবং ৩০০টির মতো কূপ খনন করেন। কৃষি, গৃহায়ণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সব খাতেই তিনি নিজেদের সর্বোচ্চটা ব্যবহার করেন। শিক্ষার হার ১৩% থেকে ৭৮% উন্নীত করেন। তিনি নারীশিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি নারীদেরকে সরকারি উচ্চপদে আসীন করতে থাকেন। বন্ধ করেন জোরপূর্বক নারীবিবাহ।

 আফ্রিকায় তখন চিকিৎসার অভাবে প্রচুর শিশু মারা যাচ্ছিল। তিনি তাই,বন্ধ হয়ে যাওয়া জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি হাম, পীতজ্বর মস্তিষ্কের প্রদাহের জন্য প্রায় ১০ লাখ শিশুকে টিকাদানের আওতায় নিয়ে আসেন। ১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা এই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শেষ হতে হতে প্রায় ২৫ লক্ষ শিশুকে এসব রোগের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়। টিকাদানের প্রোগ্রামটি ১৯৮০ সালে চালু হলেও, ততদিনে দেশের মোট শিশুর মাত্র ১৯ ভাগ এই সেবা পায়। সেটাকে তিনি মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ে প্রায় ৭৭ ভাগে উন্নীত করেন। এর ফলে তার ছোট শাসনামলে, শিশুমৃত্যুর হার ২০.% থেকে কমে ১৪.% নেমে আসে। তাই  থমাস সাংকারা আফ্রিকার কিংবদন্তী । 

তার আরেকটি লক্ষ্য ছিল নিজেদেরকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।আর এজন্য তিনি অভ্যন্তরীণ কৃষি উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দেন।এই লক্ষ্যে তিনি সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের কাছ থেকে জায়গা নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের মধ্যে জায়গা বন্টন করে দেন।উন্নত কৃষি ব্যবস্থার উপরও জোর দেন তিনি। ফলে এই দেশের অনুর্বর মাটিতে আগে যেখানে প্রতি হেক্টর জমিতে ,৭০০ কেজি গম উৎপন্ন হতো, তিন বছর পর সেটা দাঁড়ায় প্রতি হেক্টরে ,৮০০ কেজিতে! অর্থাৎ তিন বছরে খাদ্য উৎপাদন সার্বিকভাবে আগের চেয়ে ৭৫% বৃদ্ধি পায়।

আফ্রিকার মানুষের আবাসনের বিশাল সমস্যা হচ্ছে। বুরকিনা একই সমস্যা।তা দেখেই সাংকারা আবাসন খাতে হাত দেন।তখন দেশের আবাসনহীন নাগরিকদের জন্য বৃহৎ সব গৃহায়ণ প্রকল্প শুরু করেন। তবে দূরদর্শী এই প্রেসিডেন্ট, বাড়ি তৈরির জন্য শহরের দিকে না তাকিয়ে প্রান্তিক এলাকায় ইট ভাটা নির্মাণ করেন, সেগুলোর সাহায্যে চলতে থাকে দেশের মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ। তার অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম হলো, দেশকে মরুকরণের হাত থেকে বাঁচাতে সাংকারা সরকার চার বছরে প্রায় এক কোটি বৃক্ষরোপণ করে। সারাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য তিনি নির্মাণ করেন প্রায় ৭০০ কিলোমিটার রেলরোড। আর সবই হতে থাকে পুরোপুরি নিজস্ব অর্থায়নে!! 

আর নিজস্ব অর্থায়নে সব সম্ভব হয়েছে কারণ তিনি সরকারি ব্যয় একদম কমিয়ে দিয়েছিলেন।প্রথমেই তিনি সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য সরকারের গাড়িবহরের সব মার্সিডিজ বিক্রি করে দিয়ে রেনল্ট দিয়ে গাড়িবহর সাজান। রেনল্ট ছিল সেসময়ে বুরকিনা ফাসোতে বিক্রি হওয়া সবচে কম দামি গাড়ি। আর তিনি নিজের পাশাপাশি সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের বেতন অনেক হ্রাস করেন। উঠিয়ে নেওয়া হয় ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার প্রথম শ্রেণীর এয়ার টিকেট সুবিধা। সরকারি চাকুরিজীবিদের পুরো বছরের এক মাসের বেতন জন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে দান করতে বাধ্য করেন। ওগাডাগোতে সেনাবাহিনীর প্রভিশন স্টোরকে সুপারমার্কেটে রূপান্তর করে দেশের নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এটিই ছিল দেশটির প্রথম সুপারমার্কেট। নিজ অফিসে তিনি এসি ব্যবহার করতেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একজন গরীব দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসি ব্যবহার করার মতো বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ তার নেই। ব্যক্তিগতভাবে তিনি  একটি গাড়ি, চারটি মোটরবাইক, তিনটি গিটার এবং একটি ভাঙা ফ্রিজের মালিক ছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিমাসে ৪৫০ ডলার করে বেতন নিতেন, যেটি দেশটির ইতিহাসের যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় সবচেয়ে কম। একজন সঙ্গীতানুরাগী এবং গিটারিস্ট হিসেবে তিনি নিজের দেশের জন্য নতুন করে জাতীয় সংগীত রচনা করেন।

তবে অনুন্নত দেশগুলোতে উন্নয়ন করতে গেলে নানা বাধা আসে। দুর্নীতিবাজদের শকুনের নজরে পড়ে যান তিনি।কারণ এতসব উন্নয়নের ফলে দেশকে খুবলে খাওয়ার সুযোগ না পাওয়া স্বার্থান্বেষী মহল সহ্য হচ্ছিল না।তাছাড়া তখনও দেশে রয়ে গিয়েছিল ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের পা চাটা প্রেতাত্মারাও। একে একে সবাই মিলে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে ধীরে ধীরে। সাংকারারই একসময়ের সহকর্মী ব্লেইস কম্পাওহের নেতৃত্বে ১৫ আগস্ট ১৯৮৭ সালে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটান। 

এই অভ্যুত্থানের দিনেই, এন্টেঞ্জের এক কাউন্সিল মিটিং চলাকালে সাংকারাসহ আরো বারোজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। বুলেট দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় সাংকারার দেহকে। নৃশংসতার চরম পর্যায়ে গিয়ে দেহকে টুকরো টুকরো করে গোপনে মাটিচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তীতে ওগাডাগোতে তাঁর সমাধির খোঁজ মেলে। বুরকিনা ফাসোর জনগণ সাংকারাকে জাতীয় বীরের মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল। বিপ্লব ভালোবাসার জন্য তাকে আফ্রিকার চে গুয়েভারা বলা হয়। তিনি চাইতেন তার দেশের জনগণ নিজেদের প্রয়োজন বুঝুক। চেয়েছিলেন প্রয়োজনানুসারে কীভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হয় সেই আত্মবিশ্বাস তাদের মধ্যে জন্ম নিক। 

এমনই এক স্বপ্নবাজ দেশনায়ককে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই চলে যেতে হয়েছে, স্বদেশের জনগণকে স্বৈরাচারের কবলে রেখে। এলেন, দেখলেন, জয় করলেন; আবার চলেও গেলেন। তবে দেশ নয়, থমাস ইসিডোর নোয়েই সাংকারা জয় করেছিলেন জনগণের হৃদয়। তাঁর মতে, যে তোমাকে খাওয়াবে, সেই তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, তাই নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়ার জন্য নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কোন বিকল্প নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here