প্রিমিয়ার ব্যাংকের এক কাণ্ডারী রিয়াজুল করিম

0
30
প্রিমিয়ার রিয়াজুল

৩ বছরের বেশি সময় ধরে ‘দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করছেন এম রিয়াজুল করিম। এর পূর্বে তিনি দীর্ঘ ৩৬ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দেশের একাধিক বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করেছেন।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২২ বছরের যাত্রা অতি সমৃদ্ধ। যাত্রার শুরু থেকেই এই ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হয়েছে। অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে এই ব্যাংক অনেকগুলো দেশী ও বিদেশী পুরস্কার পেয়েছে। গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে এটি এখন দেশের প্রথম সারির একটি ব্যাংক হিসাবে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাংকে গ্রাহকদের ২৪ হাজার কোটি টাকার আমানত গচ্ছিত আছে। যুগ যুগ ধরে অনেক উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংক সমৃদ্ধিময় এক পথ খুলে দিয়েছে। গত দুই দশকে এই ব্যাংক তার নিজের জন্যও একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পেরেছে।

তবে ৫ বছর ধরে প্রিমিয়ার ব্যাংকের উচ্চপ্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা চলছে। ঐ সময়ে ব্যাংকের প্রতিটি সূচকে এর সাফল্য ব্যাপক ঈর্ষণীয়। বেশ আগে প্রিমিয়ার ব্যাংক ‘বাছাইকৃত’ ব্যাংকিং করতো। ৪-৫ বছর ধরে এই ধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। রিটেইল, এসএমই, কৃষিসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও কর্মীদের প্রচেষ্টায় এই সাফল্যের সম্পূর্ণ অর্জন সম্ভব হয়েছে। ব্যাংকের সম্মানিত চেয়ারম্যান ডা. এইচবিএম ইকবালের লক্ষ্য হচ্ছে প্রিমিয়ারকে ‘গণমানুষের ব্যাংক’ এ রূপান্তর করা। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

২০১৮ সালের ২৩শে এপ্রিল এম রিয়াজুল করিম প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার সময় এই ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এই বছরের মার্চ শেষে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩০ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই ব্যাংকের আমানত ছিল ১৪ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। বর্তমানে এই আমানত ২৪ হাজার ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

চলমান মহামারীর প্রভাবে গোটা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর দিয়ে সুনামি বয়ে গেছে। তারপরেও সবগুলো সূচকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের অর্জন ও দৃঢ় অবস্থান একে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছে। করোনার বছরের জন্যও ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ শেয়ারহোল্ডারদেরকে ১২.৫% নগদ ও ৭.৫% স্টকসহ মোট ২০% লভ্যাংশ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর র‍্যাংকিংয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। তবে এই ব্যাংক শীর্ষস্থানে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

দেশের যে কোনো ব্যাংকের জন্যই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ঐ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো। সময়ের সাথে সাথে চাহিদা পূরণ করতে দেশের ব্যাংকগুলোও প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক এক্ষেত্রেও কোনোভাবে পিছিয়ে নেই। ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকিং সেবা প্রদানের জন্য এরই মধ্যে ব্যাংকে একটি পূর্ণাঙ্গ কল সেন্টার চালু করা হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপের সুবিধা যুগোপযোগী করার পাশাপাশি এসব সেবার আওতা বাড়ানো হয়েছে। এই ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ‘পিমানি’ এর মাধ্যমে যে কোনো ব্যাংক ও এমএফএস একাউন্টে অর্থ স্থানান্তর, ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা ঘরে বসেই খুব সহজে করা যাচ্ছে। ‘কোর ব্যাংকিং সলিউশন’ সহ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এই ব্যাংকে বিস্তৃত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটির ‘অল্টারনেট ডেলিভারি’ আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের গ্রাহকরা ঘরে বসেই সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাংকিং সেবা পাবেন।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর মাধ্যম হিসাবে উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এই ২টি সেবার বিস্তৃতি বাড়ানোর মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংককে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থনীতির মূলস্রোতে যুক্ত হচ্ছে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাংকে আমানত রাখার সুযোগ পাচ্ছে। এদিকে ব্যাংকগুলোও নিজেদের রিটেইল, এসএমই ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে চাচ্ছে। এর পাশাপাশি নতুন নতুন প্রোডাক্ট উদ্ভাবন ও চালুর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবাকে আরো বেশি গ্রাহকবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমদানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্সসহ বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ানোর পরিকল্পনাও আছে।

আপাতদৃষ্টিতে এযুগের ব্যাংক খাতের সার্বিক অবস্থা ভালো মনে হলেও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে যে বিনিয়োগ খরা শুরু হয়েছিল, করোনা মহামারীর আবির্ভাবে তা তীব্রতর হয়েছে। এই বছরগুলোতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে দেশের অগ্রগতি ও অনেক অর্জন থাকলেও বিনিয়োগ পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়তে পারে নি। সরকারি বিনিয়োগের সাথে সংগতি রক্ষা করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ঘটে নি। বিনিয়োগের স্থবিরতার জন্য অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পুঁজিবাজারের অদক্ষতাসহ অনেকগুলো কারণ দায়ী। বিদেশী বিনিয়োগ পরিস্থিতিও কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কমে গেছে।

করোনার পরবর্তীকালে ব্যাংকিং খাত বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। সব ধরনের সুদের হারে সীমারেখা দেওয়ার ফলে ভোক্তাঋণ ও অন্যান্য রিটেইল ব্যবসায় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ অনেক কমে যাবে। পদ্ধতিগতভাবেই এসব ঋণের পরিচালন খরচ অনেক বেশি। ভোক্তাঋণের প্রবাহ কমে গেলে অভ্যন্তরীণ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা পড়ার কারণে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে বিপাকে আছে। এর ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীদের উপর এর অভিঘাত গিয়ে পড়ছে। এর কারণ হচ্ছে, ব্যাংকগুলোকে খরচ কমানোর জন্য অন্য পদক্ষেপের সাথে আমানতের সুদহার আরও কমাতে হবে। তবে আমানতের সুদহার বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়েও বেশ কম।

ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময় দেওয়া হলেও কিছু ভালো গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন। খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ মানের ঋণই বেশি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পুনর্গঠনকৃত ঋণ আদায় না হওয়া। এসব ঋণের এক কিস্তি পরিশোধ না হলেই মন্দ মানের খেলাপিতে রূপান্তরিত হয়। ঋণখেলাপিদেরকে এটি বুঝানো দরকার যে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করে কেউ ব্যবসা করতে পারবে না।

‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’ এর সংশোধনী প্রস্তাবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাতিলের ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে খেলাপি ঋণ কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অর্থঋণ আদালতে বন্দি টাকাগুলো কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনা এখন অত্যাবশ্যক। বাস্তবে অনেক ধরনের আইন থাকলেও কোনোটাই ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় করা সহজ হবে। অর্থঋণ আদালতের কাছে গেলেও সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণে বেরিয়ে আসা যায় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here