মহামারী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের প্রত্যাশা

0
4
স্বাস্থ্য বাজেট

বাংলাদেশ বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য কখনোই অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র ছিল না। তবে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য উচ্চতর ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য খাতটিতে সংস্কার করার চাহিদা জরুরি ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে এই খাতটি এখন পর্যন্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সংস্কারের ক্ষেত্রে খুব কম মনোযোগ পেয়েছে। গত ১২ বছর ধরে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের শেয়ার জিডিপির ১ শতাংশেরও কম হয়েছে। দুঃখের বিষয়, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে চলমান স্বাস্থ্য সঙ্কট সত্ত্বেও, স্বাস্থ্য খাত নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে এখনও মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে নি।

২০২০ অর্থবছরের তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরে (২০২১ অর্থবছর) স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, জিডিপির অংশ হিসাবে কেবলমাত্র স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ২০২০ অর্থবছরের ০.৮৪ শতাংশ থেকে ২০২১ অর্থবছরে ০.৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট বাজেটের অংশ হিসাবে, স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ ২০২০ অর্থবছরের ৪.৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২১ অর্থবছরে ৫.১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অতীতে আমরা এখনকার চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেখেছি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট ছিল মোট বাজেটের ৬.১৮ শতাংশ।

২০২২ অর্থবছরের জন্য সম্প্রতি অনুমোদিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ইঙ্গিত দেয় যে, স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মোট এডিপির ৭.৬৮ শতাংশ বা ১৭,৩০৬ কোটি টাকা। যদিও এটি ২০২০ অর্থবছরের তুলনায় উত্থাপিত হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে এই এডিপি বৃদ্ধি অন্যতম কম এডিপি বৃদ্ধির একটি।

২০২২ অর্থবছরের বাজেট আসন্ন হওয়ায় ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় (এমওএফ) যে প্রস্তুতি নিয়েছে তাতে কোনও পরিবর্তন আশা করার সুযোগ নেই। তবে জুনের শেষের দিকে জাতীয় সংসদে অনুমোদনের আগে এমওএফ আগামী এক মাসের (জুন) মধ্যে এর কয়েকটি সংখ্যার পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

এছাড়াও স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয় এক বছরের মধ্যেই শেষ করা যায় না। তাতে মধ্যমেয়াদি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। সেজন্য দেশের স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের জন্য নীতিনির্ধারকদের আগত বছরগুলোতে এগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ এবং সুপারিশ এখানে হাইলাইট করা যেতে পারে:

প্রথমত, এই মুহুর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হলো দেশ জুড়ে সমস্ত যোগ্য লোককে টিকা দেওয়া। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উচিত উপলব্ধ উৎস থেকে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা এবং লোকেদের বিনা মূল্যে টিকা দেওয়া। লোন দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৬ হাজার ৯৪৫ কেটি টাকা ঋণ নিয়ে আসন্ন বাজেটে ভ্যাকসিন সাপোর্ট ফান্ড তৈরির পরিকল্পনা করেছে সরকার। আশা করা যাচ্ছে, এটি একটি বৃহৎ অংশের টিকা দানের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে।

দ্বিতীয়ত, কোভিড-১৯ আক্রান্তদের আরও ভালো চিকিৎসা দেওয়ার জন্য হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি, অক্সিজেন সংগ্রহ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ পরীক্ষার সুবিধা এবং বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণের মাধ্যমে চিকিৎসা ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আরও অর্থসংস্থান প্রয়োজন। এসব স্থানে আরও চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইভস, হেলথ্ প্রফেশনাল এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়োগের জন্যও অর্থসংস্থানের পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের গঠন পরিবর্তন করা উচিত। ২০২১ অর্থবছরে মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মধ্যে ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন বাজেটের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ১.৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে নন-ডেভেলপমেন্ট বাজেটের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ২০২০ অর্থবছরের তুলনায় ২৪.৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্যই এটি একটি জাতীয় সমস্যা।

এদিকে সামগ্রিক বাজেটে উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দের পরিমাণও ২০২০ অর্থবছরের ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২১ অর্থবছরে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বাজেটের হ্রাস এমন সময়ে হতাশাজনক, যখন দেশে আরও বেশি টাকা বরাদ্দ করা প্রয়োজন ছিল।

২০২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্যের জন্য মোট বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়িক প্রবণতা অনুসরণ করে করা হয়েছে। যদিও আগের বছর স্বাস্থ্য সঙ্কটের সময় অতিরিক্ত সংস্থানগুলোর প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা হয়েছিল।

চতুর্থত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের (এমএইচএফডাব্লু) বাজেট বাস্তবায়ন ক্ষমতা উন্নত করতে হবে। অর্থ মন্ত্রনালয় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের মানদণ্ডের বিপরীতে বাজেট বরাদ্দ করে। যদিও স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ বাজেট কেবলমাত্র ২০২১ অর্থবছরে সামান্য পরিমাণে বেড়েছে এবং এমএইচএফডাব্লু তাদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পারে নি। এমএইচএফডাব্লু ২০২১ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তাদের বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছিল।

যেমনটি হয়, ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট এডিপি ব্যয়ও খুব কম ছিল। এডিপির মোট বরাদ্দের মাত্র ৪১.৯ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছিল যা স্বাস্থ্য খাতে এডিপির এই ব্যয় খুব কম ব্যয়ের মধ্যে অন্যতম।

৫৭টি মন্ত্রনালয় ও বিভাগের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় এডিপি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ৫১ তম অবস্থানে রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকটের সময়কালে এই কর্মক্ষমতা ইঙ্গিত দেয় যে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কতটা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করছে।

পঞ্চম, স্বাস্থ্যসেবাগুলোতে যে কোনও দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করার জন্য ব্যয়ের মান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত যে বহুবর্ষজীবী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বাজেট বরাদ্দ তা সমাধানের একটি অংশ মাত্র। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের দুর্নীতি ও অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা বিতরণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসন ও জবাবদিহিতা আবারও শিরোনাম হচ্ছে। মহামারী চলাকালীন এমনকি এ জাতীয় ঘাটতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব জনসাধারণের চাহিদার প্রতি সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন।

স্বাস্থ্য বাজেটের একটি বড় অংশ শারীরিক অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং মানব সম্পদের বেতন এবং ভাতায় ব্যয় করা হয়। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সম্পদের অপব্যবহার সাধারণ অনুসন্ধানী মিডিয়ার প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে- কীভাবে চুক্তিগুলো করা হয়, কীভাবে সরঞ্জাম গুলো কেনা হয় এবং কীভাবে সরঞ্জাম গুলোর দাম স্ফীত হয়, উক্ত প্রক্রিয়াতে কিভাবে গুনগত মানের সাথে আপোস করা হয় এবং কিভাবে রিসোর্চগুলোর অপচয় রোধ করা হয়।

সরকার যদি স্বচ্ছ স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ভাবে তবে গত পাঁচ বছরের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্ত সংগ্রহের উপর একটি নিরীক্ষা শুরু করা উচিত। এটি জনসম্পদের জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার দিকে অনুকরণীয় পদক্ষেপ হতে পারে।

ষষ্ঠ, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিচালনা একটি উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশে জনস্বাস্থ্য সুবিধার অপ্রতুলতা বেসরকারী স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করেছে। তবে প্রায়শই এগুলো সরকারী নজরদারির বাইরে থাকে। সরকারের উচিত তাদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ও মান নিশ্চিত করার জন্য সকল বেসরকারী স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা। নিয়ন্ত্রিত বেসরকারী স্বাস্থ্য সরবরাহকারীরা নির্বিচারে স্বাস্থ্য ব্যয় স্থির করে। তাদের স্বাস্থ্যসেবার মানও পরিবর্তিত হয়। তাই বেসরকারী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাটিকে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে একত্রিকরণ করতে হবে। শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এমএইচএফডাব্লু এর উচিত ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যগুলোর গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা।

সপ্তম, স্বাস্থ্য গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে সমর্থন করা উচিত। স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং মেডিকেল কলেজগুলোতে গবেষণার জন্য উচ্চতর সংস্থানগুলোকে উচ্চমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাথে সজ্জিত করলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে সহায়তা করবে।

অষ্টম, কার্যকর নীতি গঠনের জন্য বাস্তব সময় এবং খাঁটি তথ্য প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে বিশাল তথ্যর অপর্যাপ্ততা হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না। বেশিরভাগ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ডেটা নিয়মিত আপডেট হয় না। উচ্চ মানের ডেটা জেনারেশনের জন্য আরও ভালো সংস্থান প্রয়োজন যা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণা এবং বিশ্লেষণে সহায়তা করবে।

মহামারী করোনা ভাইরাস স্বাস্থ্য খাতে এখন একটি স্পটলাইট। যদিও এই সীমাবদ্ধতা দীর্ঘকাল ধরে রয়েছে, মহামারীটি আমাদের নতুনভাবে স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলো দেখতে সহায়তা করেছে। যদিও মহামারীটি এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় তার কার্য সম্পাদনে আশানুরূপ উন্নতি সম্পাদনের চিত্র দেখায় নি। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য উচ্চ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে আরও জনসম্পদের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এ জন্য শুধু উচ্চতর সরকারী ব্যয়ই যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতিরও প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here