রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলার তার একক আধিপত্য হারাচ্ছে

0
12
রিজার্ভ হিসেবে ডলারের আধিপত্য

ফান্ড ম্যা‌নেজার ও ধনকু‌বের স্ট্যান‌লি ড্রা‌কেন‌মিলার হু‌শিয়ারী ছুঁ‌ড়ে দি‌য়ে‌ছেন রিজার্ভ মুদ্রার দি‌কে আঙ্গুল তু‌লে। তি‌নি ব‌লেন, ” ই‌তিহাসে অর্থ‌নৈতিক প‌রি‌স্থি‌তি এখনকার মত আর কখনই এমন পর্যায়ে যায়‌নি, যেখানে আ‌র্থিক ও মুদ্রানী‌তির দিক থে‌কে কোনো কিছু করার কোনো সু‌যোগ ছিল না।” আগামী ১৫ বছ‌রের ম‌ধ্যে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্য আর থাকছে না বলেই ভ‌বিষ্যৎ বাণী করেছেন নীতিনির্ধারকেরা। রিজার্ভ হিসেবে ডলারের আধিপত্য ।

অর্থনী‌তির দিক দি‌য়ে বি‌শ্বে বৃহত্তম যুক্তরাষ্ট্র। তবে বর্তমানে দে‌শটির অর্থনী‌তিতে চা‌হিদার প‌রিমাণ অ‌নেক বেশী, মূল্যস্ফী‌তিও বাড়‌ছে। কিন্তু  এর বিপরী‌তে কম‌ছে ডলারের বি‌নিময় হার। যার কার‌ণে এ নি‌য়ে পুঁ‌জি বাজা‌রে এক ধর‌ণে উ‌দ্বেগ ছ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়ে‌ছে। ত‌বে বি‌শেষজ্ঞ‌দের ম‌তে ডলার নি‌য়ে এমন আশঙ্কা কিছু নয়। গত চার দশক ধ‌রেই এমন পূর্বাভাস‌ দিয়ে আস‌ছে। ত‌বে স্ট্যান‌লি ড্রা‌কেন‌মিলারের আশঙ্কা‌কে উ‌ড়ি‌য়ে দেয়াও যায় না। ১৯৯২ সা‌লে স্ট্যান‌লি ড্রা‌কেন মিলার এবং হা‌ঙ্গেরীয় ধনকু‌বের জর্জ সোরোস পু‌রো বিষয়‌টি অনুধাবন ক‌রেই বেশ সুন্দর এক‌টি বি‌নি‌য়োগ কৌশল সাজিয়েছিলেন এবং লাভবানও হ‌য়ে‌ছেন। নব্বই‌য়ের দশ‌কের শুরুর দি‌কে ইউ‌রোপের বিনিময় হার ব্যবস্থা থে‌কে পাউন্ড স্টা‌র্লিং এর বিদায় এমন আশঙ্কার কারণ ব‌লে জা‌নি‌য়ে‌ছি‌লেন দুজন। রিজার্ভ হিসেবে ডলারের আধিপত্য ।

‌পু‌রো বিশ্বই কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংক ব্যবস্থা‌কে নতুন ক‌রে ঢে‌লে সাজা‌চ্ছে। ডলারও অবমূল্যা‌য়িত হ‌চ্ছে দীর্ঘমেয়াদে। সব রকম প্রেক্ষাপটকে বিচার ক‌রে মুদ্রাবাজার ও বিনিয়োগ বি‌শেষজ্ঞরা ড্রা‌কেন‌মিলা‌রের মতে সায় দি‌য়ে‌ছেন। তাছাড়া ক‌রোনা মহামারীর প্রাদূর্ভাবে সৃষ্ট অস্বাভা‌বিক অর্থ‌নৈ‌তিক প‌রি‌স্থি‌তি‌কে আ‌রোও ভয়াবহ রূপ দি‌চ্ছে। আন্তর্জা‌তিক মুদ্রা তহ‌বিল ইদানীং এক সমীক্ষা চালায়।  উক্ত বক্তব্যকে সমর্থন ক‌রে‌ছে। সেখা‌নেও উক্ত বক্তব্য‌কে সমর্থন জানা‌নো হয়।  সমীক্ষা থে‌কে আ‌রোও জানা‌নো হয়, “‘২০২০ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে  (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলারের রিজার্ভের মোট পরিমাণ কমেছে ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভে ডলারের পরিমাণ নেমে এসেছে ২৫ বছরের সর্বনিম্নে। এর আ‌গে যুক্তরাষ্ট্র ডলারের ৭১ শতাংশ পতন দে‌খে‌ছিল যখন ইউরো চালু হয়”। রিজার্ভ হিসেবে ডলারের আধিপত্য ।

বর্তমান পরিস্থিতিকে যৌক্তিক বলে মনে করছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের বিশেষজ্ঞ ব্যারি আইশেনগ্রিন। দীর্ঘদিন ধরে এ বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি দিয়ে এসেছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, দ্বিতীয়  বিশ্বযু‌দ্ধের পর পৃ‌থিবী‌তে শিল্প উৎপাদনে সব‌চে‌য়ে এ‌গি‌য়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফ‌লে আমদানী ও রফতা‌নি বে‌ড়ে যায়। ফ‌লে সে সময় আন্তর্জা‌তিক ঋণ সম্প্রসারণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ তহ‌বি‌লের প্রধান মুদ্রা হ‌য়ে ওঠে। তবে বর্তমানে ডলা‌রের নিম্নমুখী পরিস্থিতিকে যৌক্তিক বলে মনে করছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের বিশেষজ্ঞ ব্যারি আইশেনগ্রিন। দীর্ঘদিন ধরে এ বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি দিয়ে এসেছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে সোভিয়েত প্রভাবমুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোৎপাদনে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সে সময় আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের মধ্যে বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম ও হয়ে উঠেছিল ডলার। একই সঙ্গে তা আন্তর্জাতিক ঋণ সম্প্রসারণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ তহবিলেরও প্রধান মুদ্রা হয়ে উঠেছিল। বর্তমান জি‌ডি‌পি হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এক- চতুর্থাংশের নী‌চে। ষা‌টের দশ‌কে মূলত ডলার অর্থ‌নৈ‌তিক বাজা‌রে শ‌ক্তিশালী হ‌য়ে ও‌ঠে। তখন বিষয়টি‌কে ফরাসী অর্থমন্ত্রী‌ গিকার্ড ডি ই‌স্টেইং  ”এক্সরবি‌টেন্ট প্রি‌ভি‌লেজ”” হি‌সেব আখ্যা দি‌যে‌ছি‌লেন। সেই সময় ডল‌রের চাহিদাও ছিল বেশী  আর ঋ‌ণের ব্যয়ও ছিল কম। যে কার‌ণে ফেডা‌রেল রিজার্ভও হ‌য়ে উঠে‌ছিল ‌বৈ‌শ্বিক মুদ্রানী‌তির নিয়ামক স্বরুপ।  

সব‌দিক থে‌কেই ডলার নির্ভর যোগ্যতা হারা‌চ্ছে। তা‌দের মুদ্রানী‌তিকেও দায়ী কর‌ছেন অ‌নে‌কে। আই এম এফ ও একই কথা বল‌ছে। ত‌বে অতীত ই‌তিহাস ব‌লে সাধারণত যুদ্ধ বা অ‌স্থির রাজনী‌তি বৈ‌শ্বিক অর্থনী‌তি‌তে আ‌ধিপত্য হারা‌নোর কারণ হয়, ত‌বে যুক্তরা‌ষ্ট্রের আ‌ধিপত্য হারা‌নোর কারণ ভিন্ন। মূল্যস্ফী‌তি নিয়ন্ত্র‌ণে ফেডারেল দীর্ঘ‌দি‌নের নী‌তি থে‌কে স‌রে আসা ও মা‌র্কিন প্রে‌সি‌ডে‌ন্ট জো বাই‌ডে‌নের উচ্চা‌ভিলাষী আ‌র্থিক নী‌তি কে দায়ী কর‌ছেন বি‌শ্লেষকগণ।

গত মাসে এফটিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে  সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ও ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদ ল্যারি সামার্স বলেন, বাইডেন প্রশাসন এখন সামষ্টিক অর্থনীতিতে আর্থিক দিক দিয়ে চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম দায়িত্বশীল নীতি অনুসরণ করছে। ব্যাখ্যা করতে গেলে দেখা যায়, ফেড এখন সম্পূর্ণ নতুন পথে হাঁটছে। আমরা এখন এমন এক অধ্যায় দেখতে পাচ্ছি, যার সঙ্গে পল ভোলকার (১৯৭৯-৮৭ পর্যন্ত ফেড চেয়ারম্যান) পরবর্তীকালের সবকিছুরই বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। সেটা পরিমাণগত ভাবে হোক বা গুণগতভাবে হোক।

গত চার দশকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেড যে আস্থার জায়গাটি অর্জন করেছিল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, মার্কিন মুদ্রানীতিসৃষ্ট মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ডলারে সংরক্ষিত সঞ্চিতি ও মূল্য হারাবে ব‌লে তিনিসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মতামত দি‌য়ে‌ছেন।

বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা তৈরির আরো কারণ রয়েছে। মহামারীর কারণে গত বছরের মার্চ থেকে ট্রেজারি মার্কেটও (সরকারি সিকিউরিটিজ মার্কেট) মারাত্মক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি মার্কেটকে সবচেয়ে বেশি তারল্যযুক্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্র ধরা হলেও বর্তমানে এ বাজারের তারল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

গত বছরের মার্চের শুরুর দিকে কোভিড-১৯ আতঙ্কের কারণে শুরুতে মার্কিন ট্রেজারি মার্কেটের দিকে ঝুঁকেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু ৯ মার্চের পর থেকে গোটা পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে থাকে। সে সময় দেশটির ট্রেজারি মার্কেট থেকে (সরকারি বন্ড, বিল ও ট্রেজারি নোট) অনেকটা বিশৃঙ্খলভাবে নগদ মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। ব্যাসেলভিত্তিক ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরা তড়িঘড়ি করে নগদ মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়ায় হেজ ফান্ডগুলোও তড়িঘড়ি করে ট্রেজারি বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। ফলে ট্রেজারি মার্কেটে এক ধরনের বিক্রয়চাপ তৈরি হয় এবং সরকারি বন্ড, বিল ও ট্রেজারি নোটেরও বাজার পড়ে যায়। অথচ মুনাফার আশায় এসব ট্রেজারি ফান্ড এর আগে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিয়েছিল। এ অবস্থায় ট্রেজারি ফান্ডগুলোর আর্থিক সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাদের ঋণদাতারাও ঋণ ফেরত নিতে উদ্যোগী হয়। ফলে ট্রেজারি মার্কেটে বিক্রয়চাপ আরো বেড়ে যায়। নিরাপদ বিনিয়োগের বাজার ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠতে থাকে।

 এ অবস্থায় ধসে পড়া থেকে সুরক্ষা দিতে বাজারটিতে তারল্যের প্রবাহ বাড়াতে থাকে ফেড। একই সঙ্গে ব্যাংক নীতিতেও ছাড় দেয়ার মাধ্যমে ব্যাপক হারে মূলধন সরবরাহ করা হয়। ফেডের হস্তক্ষেপ বাজারটিকে আপাতত রক্ষা করলেও আরেক আশঙ্কা জন্ম নিয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, এ হস্তক্ষেপের কারণে বাজারটিতে তারল্য সংকট নিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ঋণ ও জিডিপির অনুপাত এখন রেকর্ড সর্বোচ্চ এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে জনগণের হাতে ট্রেজারি সিকিউরিটির পরিমাণ বাড়তে বাড়তে শিগগিরই তা ডিলার ব্যালান্সশিটকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের গুরুত্ব হারানোর পেছনে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে মার্কিন রাজনীতির অকার্যকর ভূমিকা। মার্কিন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে অনেক প্রকট করে ফুটিয়ে তুলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে বাইডেন এখন দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নীতি বাস্তবায়নের পথে ফিরে গিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু ট্রাম্পের আমলের সংরক্ষণবাদ থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেননি তিনি।

 রিজার্ভ তহবিলের মুদ্রা হিসেবে ডলারের জন্য বিষয়টিকে দুঃসংবাদ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বাইডেন প্রশাসন এখন অভূতপূর্ব এক প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে অনেক আগ্রাসী আর্থিক নীতি গ্রহণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অতীতের অর্থনৈতিক সংকটগুলোর ঠিক পর মুহূর্তে যে ধরনের আর্থিক নীতি নেয়া হয়েছিল, বাইডেনের বর্তমান নীতি তার চেয়েও অনেক বেশি আগ্রাসী। উচ্চপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে হাতে নেয়া বাইডেন প্রশাসনের এ আগ্রাসী নীতি ডলারের জন্য কিছুটা স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here