লালন শাহ’র সমা‌ধি কম‌প্লেক্স

0
20
লালন শাহের সমাধি কমপ্লেক্স

লালন শাহ’র জীবদ্দশায় জঙ্গলাকীর্ণ ছেঁউড়িয়ায় এই স্থলে ছিলো শাল কাঠের খুটির উপর খড়ের ছাউনি। তাঁর এই সাধনস্থল ও এখানেই মৃত্যু পরবর্তীতে নির্মিত সমাধি ঘিরে এখন প্রাচীর বেষ্টিত অট্টালিকা কন্টকিত লালন শাহ’র সমাধি কমপ্লেক্স। পড়ুন লালন শাহের সমাধি কমপ্লেক্স । 

বর্তমান স্মৃতি সৌধটি নির্মিত আরেক সূফী সাধক হযরত নিজাম উদ্দীন আউলিয়ার মাজারের অনুকরণে। ১৩৭০ বঙ্গাব্দের ( ১৯৬৩) ১৩ ই আশ্বিন তা উদ্বোধন করেন তৎকালীন গভর্ণর মোনায়েম খান। একসময়কার অরণ্য মাঝে ছায়া সুনিবিড় বাউল ফকিরদের পর্ণকুটিরের স্থলে এখন নির্মিত অট্টালিকায় সর্বত্র ছাপ সরকারি বদান্যতা/ উন্নয়নের।

মনে হতে পারে সরকারের কৃতিত্ব এই সৌধ নির্মানে। শত প্রতিকূলতার সাথে বিস্তর সংগ্রাম করে লালন স্মৃতি রক্ষার মূল কৃতিত্ব লালন শিষ্য বাউল ফকিরদের । এই মাজার কমপ্লেক্স, তখনকার আখড়া একান্তভাবেই ছিলো লালন শিষ্য লালন ভক্ত বাউল ফকিরদের। লালন শাহের সমাধি কমপ্লেক্স । 

নজর দেয়া যাক এই আশ্রম প্রতিষ্ঠার গোড়ার দিকে। নিজ গ্রাম, সমাজ আর পরিবার থেকে তো বিচ্যুত হন লালন আগেই। কারণ গঙ্গার তীর হতে উদ্ধার করা স্বগোত্রীয়দের দ্বারা পরিত্যক্ত মুমূর্ষু লালন আশ্রিত হয়ে অন্ন ভোজন করেন মুসলিম গৃহে।

গুরু সিরাজ সাঁইয়ের মৃত্যুতে আনুমানিক ১৮২৩ সালে ( ১২৩০ বাংলা) লালন শাহ তাই ফিরে আসেন সেই তন্তুবায় মলম কারিকরের বাড়ি। মুমূর্ষু লালনকে নব জীবন দানকারী মতিজান ফকিরানীর স্বামী মলম কারিকর।

গুরু সিরাজ সাঁইর নির্দেশ ছিল সাধন ভজনের জন্য আখড়া নির্মানের। মলম কারিকর দান করেন তাঁর বাড়ির দক্ষিণ দিকের ১৬ বিঘা জমি।  সেখানেই লালন গাড়েন তাঁর স্থায়ী আস্তানা।

কাঙাল হরিনাথের গ্রামবার্তা পত্রিকায় ১৮৭২ এ মুদ্রিত সংখ্যায় সম্পাদকীয় নিবন্ধে আছে, ” ৩/৪ বৎসরের মধ্যে এই সম্প্রদায় ( লালন অনুসারী) অতিশয় প্রবল হইয়াছে।” তাই, অনুমিত হয় ১৮০০ এর পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে লালন ছেঁউড়িয়াতে স্থাপন করেছিলেন এই আখড়া। আজ হতে প্রায় পৌনে দু’শত বৎসর পূর্বে।

যে ‘হকের ঘরে’ করতেন সাধন ভজন, অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী ফকিরী রীতি অনুযায়ী সমাধিস্থ করা হয় সেখানেই। গোলাকৃতি খড়ের ছাউনি, চতুর্দিকে বারান্দা, পূব-দুয়ারি ঘর ছিলো এই হকের ঘর। লালনের গচ্ছিত অর্থ দিয়েই লালন শিষ্য শীতল ও ভোলাই শাহ ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মান করেন লালনের সমাধি। এই হকের ঘরেই লালনের বাঁধানো সমাধি।

তাঁরই নির্দেশ মতে কোন পারলৌকিক ক্রিয়া নয়, মৃত্যুর পর করা হয় সাধু সেবা বা ভান্ডারা। শিষ্যদের ভিক্ষা দ্বারা সাধুদেরকে নিয়ে করা হয় নৃত্যগীতের এই মহোৎসব। সেই থেকেই লালনের তিরোধান দিবসে লালন অনুসারীরা প্রতি বৎসর ভক্তি সহকারে পালন করে আসছেন এই সাধু সঙ্গ।

লালনের প্রয়াণের পর লালন আখড়া পরিচালনের জন্য গঠন হয় ‘লালন শাহ ফকিরের আখড়া কমিটি’। ইসমাইল ফকির ছিলেন সুদীর্ঘকাল ছিলেন এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ১৯৪৫ সালে খাজনার দায়ে নিলাম হয় লালনের আখড়া বাড়ি। তখন আখড়া কমিটির পক্ষে একশত সাত টাকা চার আনায় ক্রয় করে সম্পত্তিটি রক্ষা করেন কমিটির সম্পাদক ইসমাইল ফকির।

১৯৪৮ এর ঝড় ও বজ্রপাতে বিদ্ধ্বস্থ হয় সমাধি সৌধের দক্ষিণ দিক।

সৌধ নির্মানের শুরুর দিকের আর্থিক অবদান ছিল ইসমাইল ফকির, কোকিল শাহ, কালু শাহ প্রমুখ লালন ভক্ত বৃন্দের।  নগদ অর্থ ছাড়াও মাজারের জন্য মোহিনী মিলের তহবিল থেকে ক্রয় করা হয় মাজারের সামনের জায়গা।

কিন্তু শুরু হয়েও শেষ হয়নি সমাধি সৌধের নির্মান কাজ। ১৯৬১ তে লালন স্মরণোৎসবে যোগ দিতে আসেন লোক সংস্কৃতি সংগ্রাহক ও ‘হারামণি’ রচয়িতা মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন। লালনের স্মৃতিসৌধ নির্মানের বিষয়ে তিনি আলোচনা করেন কুষ্টিয়ার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের সাথে। স্থানীয় সুধী ও ব্যবসায়ীরা অনুদান দেন।

কোকিল শাহ, আফতাব শাহ, কালু শাহ প্রমুখ লালন ভক্ত বৃন্দের মোট ত্রিশ হাজার, সরকারের বরাদ্দ পঞ্চাশ হাজার – ১৯৬১ তে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট স্থাপন করেন ভিত্তিপ্রস্তর, ১৯৬৩ তে যা উদ্বোধন করেন গভর্ণর মোনায়েম খান।

লালনের প্রয়াণের পর লালন আখড়া পরিচালনের জন্য গঠিত ‘লালন শাহ ফকিরের আখড়া কমিটি’র নাম পরিবর্তন করা হয় ‘লালন মাজার শরিফ কমিটি’তে।

পর্যায়ক্রমে সমাধিক্ষেত্রের পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয় লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র যা পরবর্তীতে ১৯৭৬ – এ হয় লালন একাডেমী। এই ছিল লালন সমাধি চত্বরে ইমারত নির্মানের শুরু। লালনের মাজারের ভাব গাম্ভীর্য্যের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক কর্মকান্ডের এবং লালন তীর্থে লালনের প্রকৃত ভাব শিষ্যদের কোনঠাসা হওয়ার সূচনা।

১৯৬৩ তে বর্তমান এই স্মৃতিসৌধ নির্মানের পর ১৯৭৬ – এ  একাডেমিটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয় লালনের আখড়া থেকে বাউল-ফকির-সাধুদের বিতাড়ন।

১৯৮৪ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি লালনের আখড়ায় ডাক দেন ধর্মসভার। মানবধর্মে বিশ্বাসী বাউলেরা বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করলে রিজার্ভ পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাউল-ফকির-কে পিটিয়ে বের করে দেয়া হয় তাদের আখড়া থেকে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here