বহুগুণের অধিকারী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

0
8
লিওনার্দো

রবিবার (২রা মে) লিওনার্দোর মৃত্যুবার্ষিকী চলে গেলো। ইতালির রেনেসাঁর সবচেয়ে প্রতিভাবান এই চিত্রশিল্পী ১৫১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে লিওনার্দোকে শুধুমাত্র একজন চিত্রশিল্পী বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন একই সাথে ভাস্কর, স্থপতি, প্রকৌশলী, সঙ্গীতজ্ঞ, শরীরতত্ত্ববিদ, ভূতত্ত্ববিদ ইত্যাদি। শুধু ‘মোনালিসা’, ‘দ্য লাস্ট সাপার’, ‘সালভাতর মুন্ডি’, ‘ভিট্টুভিয়ান ম্যান’ কিংবা ‘দ্য ভার্জিন অব দ্য রকস’ তাঁর পরিচয় নয়। তিনি পাখির উড়ার কৌশল নিয়ে প্রায় ৫০০ এর কাছাকাছি স্কেচ এঁকেছেন, আবার তৎকালীন সময়ে উড়োজাহাজের নকশাও করেছেন। আজ থেকে ৫০০ বছরের আগের বাস্তবতায় বসে তিনি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিখুঁত ছবি এঁকে গেছেন। কয়েক হাজার অক্ষরে নোটবইয়ের পাতায় তিনি তাঁর সবগুলো দুর্দান্ত প্রকৌশলী ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনাগুলো লিখে গেছেন। লিওনার্দোর ‘কোডেক্স’ নোটখাতা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ধনকুবের ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের কাছে আছে।

লিওনার্দো

লিওনার্দো

লিওনার্দো

ইতালির তুসকানের পাহাড়ঘেরা গ্রাম ভিঞ্চিতে লিওনার্দো জন্মগ্রহণ করেছেন। বাবা পিয়েরে দ্য ভিঞ্চি এবং মা মা কাতেরিনা দি মিও লিপ্পি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মার্টিন কেম্পের মতে, লিওনার্দোর মা কাতেরিনা ছিলেন পিতা-মাতাহীন অনাথ গ্রাম্য এক মেয়ে। ফ্লোরেন্সের সম্ভ্রান্ত নোটারি ও পরবর্তী সময়ে চ্যান্সেলর পিয়েরের সঙ্গে কখনই তাঁর বিয়ে হয় নি। ধারণা করা হয় যে লিওনার্দোর মায়ের পরিবার মূলত উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা দাস পরিবার ছিল। শ্রেণীবৈষম্য ও সংস্কারের ধাঁধার গ্যাঁড়াকলে লিওনার্দোর শৈশব অন্য শিশুদের মতো নির্মল ও সহজ হয় নি। তিনি যেমন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান নি, তেমনি শৈশবেই মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। তাই মায়ের সঙ্গে লিওনার্দোর একটি স্মৃতি ছাড়া আর কোনো স্মৃতি নেই বললেই চলে।

লিওনার্দোর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ফ্রান্সিস্কো মেলজি থেকেছেন। তিনিও ছবি আঁকতেন ও লিওনার্দোর সেক্রেটারি হয়ে কাজ সামলাতেন। জিয়ান গিয়াকোমো ক্যাপ্রোতি দ্য ওরেনো (সালাই) ছিলেন লিওনার্দোর ছাত্র, শিষ্য, সতীর্থ ও সব কাজের সহযোগী। সালাইয়ের আবার হাত সাফাই করার অভ্যাস ছিল। তিনি তাঁর গুরুর কাছ থেকেই কমপক্ষে ৫ বার চুরি করেছেন। লিওনার্দোর অন্যান্য ছাত্র ও শিক্ষানবিশরা তাঁকে নিয়ে কম অভিযোগও করে নি। তবে লিওনার্দো তাঁকে আদর করে নাম দিয়েছেন সালাই, অর্থাৎ ‘লিটল ডেভিল’। লিওনার্দো সালাইকে কখনই সঙ্গছাড়া করেন নি। সালাই মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর কাজের সাহায্যকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ছবিও এঁকেছেন ‘আন্দ্রে সালাই’ নামে। মোনালিসার অনুকরণে তিনি এঁকেছেন ‘প্রডো মোনালিসা’ কিংবা ‘মোন্না ভান্না’। লিওনার্দোর অনেকগুলো ছবির মডেলও হয়েছেন, যেমনঃ ‘সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট’। ইতালির বেশ কয়েকজন গবেষক তো এমনটাও দাবি করেছেন যে মোনালিসা ছবির মডেল মোটেও ‘লিসা দেল জিয়োকান্দো’ নয়, সালাই ন ইজেই। লিওনার্দো সমকামী ছিলেন বলে তাঁকে নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সালাইয়ের সঙ্গে তাঁর তেমন ধরনের সম্পর্কের কথাও ধারণা করা যায়।

লিওনার্দো

লিওনার্দো তাঁর জীবনের প্রথম চাকরিটি পেয়েছিলেন নাট্য প্রযোজনার। এই কাজ করতে করতে তিনি বিভিন্ন পারস্পেক্টটিভ ব্যবহারের কৌশলগুলো শিখেছিলেন। কিভাবে কোথায় কোন জিনিস রাখলে তা দর্শকদের চোখে পড়বে ও ভিন্ন ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হবে, মঞ্চে কাজ করতে গিয়ে সেসব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এর নিদর্শন দেখা গেছে তাঁর দ্য লাস্ট সাপারে। টেবিলে কোথায় কিভাবে কোন খাবার ও কোন পানীয়ের পাত্র রাখা হবে, যীশুর সহচরদের মুখভঙ্গি, অভিব্যক্তি ইত্যাদি কেমন হবে, তা নিয়ে তিনি রীতিমতো গবেষণা করে কাজে নেমেছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের মানুষের মুখের স্কেচ এঁকে লাস্ট সাপারের মুখগুলোকে খুঁজে নিয়েছিলেন। তবে নাট্য প্রযোজক হিসেবেও তিনি বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন। তিনি ফ্লাইং মেশিন ও উড়োজাহাজ স্ক্রু ব্যবহার করে শিল্পীদের (‘দেবদূত’ চরিত্রে যারা অভিনয় করেছিলেন) মঞ্চের উপর থেকে নিচে নামিয়ে এনে দর্শকদেরকে চমক দেখিয়েছিলেন। কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যবর্তী রেখাগুলোকে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বলেই সত্যিকারের ফ্লাইং মেশিনের নকশা করেছিলেন।

লিওনার্দো

মা থেকে বিচ্ছিন্ন লিওনার্দোর শৈশব কেটেছে তাঁর দাদা-দাদীর সঙ্গে। তবে তিনি ১২ বছর বয়সে ফ্লোরেন্সে এসে বাবার সাথে বসবাস শুরু করেছিলেন। ২ বছরের মধ্যে বাবার টাকায় ‘আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিও’ এর স্টুডিওতে কাজ শেখার সুযোগ জুটেছিল। ভেরোচ্চিও তৎকালীন সময়ে ফ্লোরেন্সের একজন নামকরা শিক্ষক ও চিত্রকর। ভোরোচ্চিওর ছাত্রদের মধ্যে সবসময় তুমুল প্রতিযোগিতা চলতো যে কে হবেন তাঁর প্রথম শিষ্য। একদিন লিওনার্দোর কাজ দেখে ভেরোচ্চিওকে এই পদের জন্য দ্বিতীয় কারও কথা ভাবতে হয় নি। তখন তিনি ‘দ্য ব্যাপ্টিজম অব ক্রাইস্ট’ ছবিটি আঁকার জন্য কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, সহকারী শিল্পী হলেন লিওনার্দো। এই ছবিতে যে ২জন দেবদূত আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বামেরটা লিওনার্দো এঁকেছেন।

লিওনার্দো

শিষ্য যে কখনও কখনও গুরুকেই ছাড়িয়ে যেতে পারেন, সেই ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন লিওনার্দো। ছবিটি যখন সবাইকে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তখন বামের ঐ দেবদূতে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সবাই, কারণ সেটি ছিল প্রাণবন্ত ও নিখুঁত ছবি।

লিওনার্দো শুধুমাত্র ছবিই আঁকেন নি, নতুন নতুন উদ্ভাবন আবিষ্কারেও মেতে থাকতেন। চিত্রকলার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ছবি তাঁর মোনালিসা, যা মানুষের আঁকা সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রকর্ম। কিন্তু এই মোনালিসাকে লিওনার্দো যদি তাঁর মতো করে পরিপূর্ণভাবে আঁকতে পারতেন, তাহলে চিন্তা করলেই অবাক লাগবে যে মোনালিসা আসলেই দেখতে কেমন হতো। তিনি ১৫০৩ সালে আঁকতে শুরু হলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোনালিসাকে এঁকেছেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে অল্প অল্প করে তুলির টান দিয়েও তাঁর কাছে মোনালিসা অসমাপ্ত একটি শিল্প ছিল। লিওনার্দো এতই পারফেক্টশনিস্ট ছিলেন যে তিনি একটি স্কেচের অসংখ্য ভার্সন আঁকতেন এবং পরে তাতে রঙ-তুলির আঁচড় দিতেন। তিনি যেমন অনেক ছবি এঁকেছেন, তেমনি অনেক ছবি পুড়িয়েও ফেলেছিলেন।

লিওনার্দো

এখন আসা যাক মায়ের সঙ্গে লিওনার্দোর সেই স্মৃতির কথায়। শিশু লিওনার্দোকে দোলনায় রেখে মা যখন তাঁর হাতের কাজ সারছিলেন, তখন হঠাৎ করে একটা বাজপাখি উড়ে এসে দোলনার উপর বসে বারবার ডানা ঝাপটাচ্ছিল। পাখিটা তার ডানা দিয়ে লিওনার্দোকে ছুঁয়েছিল। কোনোমতে ঐ পাখিকে তাড়িয়ে লিওনার্দোকে নিয়ে তাঁর মা গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক এক নারীর কাছে ছুটলেন, কারণ তিনি ভবিষ্যত্ বলতে পারতেন। ঐ বৃদ্ধা তাঁকে বলেছিলেন যে লিওনার্দো অভিশপ্ত। সে যা ভালোবাসবে, তা ধ্বংস করে ফেলবে। সারা জীবন একা হয়ে থাকতে হবে।

অনেকে তা মানতে নারাজ হলেও বাস্তবে কিন্তু এমনটাই ঘটেছে বলে ধরা যায়, কারণ লিওনার্দোর আঁকা ছবির খুব অল্পকিছুই বর্তমানে টিকে আছে। তিনি কখনও বিয়ে করেন নি। বন্ধুদের নিয়ে অনেক হইচই, আড্ডা ইত্যাদি জমিয়ে রাখলেও সৃষ্টির ঘোরগ্রস্ত লিওনার্দো আজীবন একপ্রকার একাই থেকে গেছেন।

লিওনার্দো ১৪৭৪ সালে ‘জেনেভ্রা দি বেনচি’ এর ছবি আঁকার জন্য কমিশনপ্রাপ্ত হন। জেনেভ্রার বাবা ‘আমেরগো’ ইতালির একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর এই মেয়ের বিয়ে হতো। তাই এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেই লিওনার্দোকে ‘পোর্ট্রেট’ আঁকার কাজটি শেষ করতে হবে। জেনেভ্রা ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী নারী। লিওনার্দো আবিষ্কার করলেন যে জেনেভ্রার হবু বর ‘নিকোলিনি’ এর চেয়ে তিনি বরং ফ্লোরেন্সের অ্যাম্বাসেডর ‘বার্নার্ডো বেম্বো’ এর সান্নিধ্য বেশি উপভোগ করেছেন। লিওনার্দো ছবিটি আঁকার কাজ সমাপ্ত করলে দেখা গেলো যে জেনেভ্রা হাতে পাম ও লরেন (এক ধরনের গুল্ম) পাতা ধরে আছেন। ততদিনে বার্নার্ডোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনাও শুরু হয়েছিল। লিওনার্দোর এমন কাজে আমেরগো ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছিলেন। এর কারণ হচ্ছে, পাম ও লরেন পাতা ছিল বার্নার্ডোদের বংশের প্রতীক বা স্মারক চিহ্ন। আমেরগো রেগেমেগে ঐ ছবির নিচের হাতের অংশটুকু কেটে ফেললেন এবং লিওনার্দোকে টাকা-পয়সা না দিয়ে তিরস্কার করেই বিদায় দিলেন। তবে ‘দ্য পোর্ট্রেট অব জেনেভ্রা বেনচি’ লিওনার্দোর সমাপ্ত কাজগুলোর একটি। তাই এখন যে চিত্রকর্মটি দেখা যায়, সেখানে জেনেভ্রার হাতের সেই অংশটুকু আর নেই।

লিওনার্দো

তখন লিওনার্দো ‘অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই’ নিয়েও কাজ করছিলেন। তাঁর বাবা পিয়েরে দ্য ভিঞ্চি তাঁকে কাজটি জুটিয়ে দিয়েছিলেন। জেনেভ্রার ছবির এমন পরিণতি নিয়ে যখন তিনি খুব বিষণ্ন ছিলেন, তখন ‘অগাস্টিনিয়ান সন্ন্যাসী’ দের প্রতিনিধিরাও তাঁর অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই নিয়ে সন্তুষ্ট হন নি। তাই লিওনার্দো এ কাজও আর শেষ করেন নি।

লিওনার্দো

এদিকে ফ্লোরেন্স ছেড়ে লিওনার্দো মিলানে চলে গেলেন। ১৪৮২ সালের দিকে মিলানের ডিউক ‘লুদোভিকো’ তাঁকে ঘোড়ার একটি ভাস্কর্য তৈরির কথা বলেছিলেন, যাতে ফুটে উঠবে তাঁর বাবার বীরত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের দৃশ্য। তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী লিওনার্দো ২৪ ফুট উচ্চতার একটি ভাস্কর্যের নকশা করেছিলেন এবং তা ব্রোঞ্জ দিয়ে বানাতে চেয়েছিলেন। লুদোভিকো এই চাহিদামতো প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্রোঞ্জ সরবরাহও করেছিলেন। কিন্তু ঐ যে নিখুঁত করার যে ধাঁত, তাতে লিওনার্দো অনেক বেশি সময় নিতেন। এর মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল ১৪৯৯ সালের যুদ্ধ। নিরুপায় হয়ে একসময় লুদোভিকো লিওনার্দোকে দেওয়া সেই ব্রোঞ্জগুলো অস্ত্র তৈরির দরকারে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হলো না। ফরাসিরা মিলান দখল করে নিয়েছিল। লুদোভিকো বন্দি হয়েছিলেন। এদিকে ফরাসি সৈন্যরা লিওনার্দোর ‘দ্য গ্রেট হর্স’ এর মাটির তৈরি কাঠামো ভেঙে ফেলেছিল।

লিওনার্দো

সেই সময়ে শিল্পী হিসেবে তাঁর কনিষ্ঠ প্রায় ‘রাফায়েল’ কিংবা ‘মাইকেলেঞ্জেলো’ এর মতো ব্যক্তিরা যখন ফ্লোরেন্স দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, লিওনার্দো তখন একের পর এক অসমাপ্ত কাজ ছেড়ে দিচ্ছিলেন। মাইকেলেঞ্জেলো মাত্র ২৯ বছর বয়সে যখন তাঁর ‘ডেভিড’ ভাস্কর্যের কাজ শেষ করে ফ্লোরেন্সে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিলেন, লিওনার্দো তখন ‘ফ্রান্সেস্কো দেল জিয়োকান্দো’ এর কাছ থেকে তাঁর স্ত্রী ‘লিসা দেল জিয়োকান্দো’ এর ছবি আঁকার জন্য কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তখন থেকে মোনালিসা শুরু হয়েছিল।

ক্ল্যাসিক যুগের গুরুদের কাজ থেকে লিওনার্দো অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের অনুকরণ করেন নি। মাইকেলেঞ্জেলোর ডেভিড দেখে তাই লিওনার্দো মন্তব্য করেছিলেন যে মাইকেলেঞ্জেলো তো সবসময় কাজে ‘স্পিরিটের’ কথা বলতেন। কিন্তু ডেভিড তো চিত্রকলার ক্ল্যাসিক ধারার অন্ধ অনুকরণ ছাড়া কিছু না। লিওনার্দো তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি কিছু আশা করেছিলেন। মাইকেলেঞ্জেলোর অবশ্য উত্তরে বলেছিলেন যে লিওনার্দো তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো আগে সম্পন্ন করে দেখাক।

লিওনার্দো ও মাইকেলেঞ্জেলোকে নিয়ে দারুণ কিছু ঘটনাও আছে। ফ্লোরেসের তৎকালীন শাসকরাও এই ২ শিল্পীর দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে অনেক উসকে দিয়েছিলেন। ইতালির রেনেসাঁর এ গুরুদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দিতে ফ্লোরেন্সের ‘পালাজো ভ্যাকিও’ এর দেওয়ালে লিওনার্দোকে ‘দ্য ব্যাটেল অব অ্যাঙ্গিয়ারি’ আঁকতে কমিশন দেওয়া হয়েছিল। ঐ দেওয়ালের ঠিক বিপরীত দেওয়ালে মাইকেলেঞ্জেলোকে ‘দ্য ব্যাটেল অব ক্যাসিনা’ আঁকার জন্য বলা হয়েছিল।

লিওনার্দো

লিওনার্দো

মাইকেলেঞ্জেলো চেয়েছিলেন লিওনার্দোকে বিরক্ত করতে। তাই তিনি কাজের সময় অহেতুক হইচই করে লিওনার্দোর মনোযোগ খানিকটা নষ্টও করেছিলেন। কিন্তু লিওনার্দো বলতে গেলে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিলেন। প্রেম-ভালোবাসা, ঘৃণা-বিদ্বেষ কোনো কিছুই যেন তাঁকে স্পর্শ করতো না। তিনি কাজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন। রঙের সঙ্গে তেল মিশ্রিত করলে ছবিতে কেমন বাড়তি উজ্জ্বলতা যোগ হয়, তা তিনি দেখিয়েছিলেন। পালাজো ভ্যাকিওর দেওয়ালে ছবি আঁকার জন্য তাঁকে যখন স্বল্প সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল, তখন কাজ শুরু করতে গিয়ে তিনি দেখলেন যে দেওয়াল থেকে এমনিতেই চুন খসে পড়ছিল। নতুন করে প্লাস্টার করার মতো সময়ও তখন ছিল না। তাই তিনি রঙের মধ্যে মোম মিশিয়ে দিলেন এবং দেখলেন যে এভাবে করে রঙগুলো ঠিকঠাক লেগে থাকছিল। কিন্তু এই এক্সপেরিমেন্ট ছিল অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। কিছুদিনের মধ্যে দেখা গেল যে রঙ গলে স্কেচ ও ফিগারগুলো নষ্ট হতে শুরু করেছিল।

এরপর বাবার মৃত্যু, কাজে মনোযোগ দিতে না পারা – সবকিছু মিলিয়ে বিধ্বস্ত লিওনার্দো হঠাৎ এই কাজও ছেড়ে দিয়েছিলেন। হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন যে কারও সাথে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় তাঁকে মানাতো না। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে পরবর্তী সময়ে মাইকেলেঞ্জেলোও এ কাজ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

প্রায়ই একটি প্রশ্ন করতেন লিওনার্দো। তা হচ্ছে যে আকাশের রঙ কেন নীল। তিনি অনুসন্ধানী ও উৎসাহী মন নিয়ে উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছেন যে মানুষের হৃদতন্ত্র কিভাবে কাজ করে, কিংবা পাখির ডানার উপরে-নিচে বাতাসের চাপের তারতম্য কেন হয় — এসব প্রশ্নের।

লিওনার্দোর জীবনজুড়ে যেমন অনেক গল্প-ঘটনা-তর্ক আছে, তেমন তাঁর মৃত্যুর মুহূর্ত ঘিরেও কাহিনী চালু আছে। যেমনঃ ফ্রান্সের রাজার কোলে নাকি তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

রাজা প্রথম ফ্রান্সিস লিওনার্দোর স্বজন মানুষ ছিলেন। তিনি এমন প্রতিভাকে শ্রদ্ধা-সমীহ দুইটিই করতেন। তাই লিওনার্দোর মৃত্যুর সময় তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়ার উপায়ও নেই। ‘দ্য ডেথ অব লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি’ — ফরাসি শিল্পী ‘জোঁ অগুস্তো দোমিনিক আঁনগ্রা’ এর আঁকা এ চিত্রকর্মতে সেই দৃশ্যকেই ধারণা করে আঁকা হয়েছিল।

লিওনার্দো

ইতিহাস রচয়িতাদের অনেকে অবশ্য দাবি করেছেন যে লিওনার্দোর মৃত্যুর সময় রাজা ফ্রান্সিস অ্যাম্বুয়াসের কাছাকাছি কোথাও ছিলেন না। তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজকাজে নিযুক্ত ছিলেন। দলিলে স্বাক্ষর করতে বসতেন – ঠিক এর আগমুহূর্তে লিওনার্দোর অসুস্থতার খবর পেলে সব ফেলে তখনই তিনি ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে লিওনার্দো মৃত্যুর কাছে হার মেনেছিলেন। শিল্পী ও লেখক ‘জর্জিও ভাসারি’, যাকে লিওনার্দোর সমসাময়িকও বলা হয়, অবশ্য বলে গেছেন যে ‘মেলজি’ তাকে জানিয়েছিলেন যে রাজার কোলেই লিওনার্দোর মৃত্যু হয়েছিল।

দ্য ডেথ অব লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছবিটি এঁকেছেন দোমিনিক আঁনগ্রা। লিওনার্দোর মৃত্যুর প্রায় ৩০০ বছর পর রোমে নিযুক্ত তৎকালীন ফরাসি রাষ্ট্রদূত কর্তৃক কাজটি করার জন্য তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

মৃত্যুর পর লিওনার্দো সেন্ট ফ্লোরেন্টিন গির্জার কাছে সমাহিত করা হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের ক্ষত নিয়ে গির্জাটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে গির্জাটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাই লিওনার্দোর সমাধিক্ষেত্রটিও আর শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

‘সিগমুন্ড ফ্রয়েড’ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সম্পর্কে বলেছেন যে বাকিরা যখন ঘুমাচ্ছিল অন্ধকারের মধ্যে, তখন তিনি একা জেগে উঠেছিলেন। সময়ের আগে তাঁর ঘুম ভেঙেছিল এবং এই কথা অস্বীকার করারও কোনো উপায় নাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here