৫ লক্ষ কোটি টাকার তারল্য ফিরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে

0
1
ব্যাংক তারল্য

গত অর্থবছরে তারল্য সংকট ও মহামারীতে নগদ টাকা উত্তোলনের চাপ — এ ২টি মিলে মুদ্রাবাজারে অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই সময়ব্যাপী রেকর্ড ৫ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা যোগান দিতে হয়েছিল। ‘রেপো’, ‘স্পেশাল রেপো’ ও ‘অ্যাশিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট’ (এএলএস) হিসাবে এই পরিমাণ তারল্যের যোগান দিতে হয়। রাজস্ব ঘাটতির চাপে থাকা সরকারকেও এই অর্থের যোগান দিতে হয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষের দিকে তারল্য পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। মুদ্রাবাজারে যোগান দেওয়া প্রায় সম্পূর্ণ অর্থই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় প্রত্যেকদিনই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রেপো, স্পেশাল রেপো ও এএলএস হিসাবে ব্যাংকগুলোকে অর্থ ধার দিতে হয়েছিল। এই অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্তও এমন পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাসের পর থেকে পরিস্থিতি পুরো পাল্টে গেছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এসব ব্যাংকগুলোকে ধার করতে হচ্ছে না। এর ফলে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রেপো, স্পেশাল রেপো ও এএলএসের অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে এসেছে। ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত তারল্যের চাপ থাকায় কলমানি বাজারের সুদের হারও বর্তমানে ইতিহাসের সর্বনিম্ন।

গত এপ্রিল মাসে কলমানি বাজারের গড় সুদের হার ছিল ১.৬৮%। ২০১২ সালে কলমানি বাজারের গড় সুদের হার ১২.৮২% পর্যন্ত উঠেছিল। এই বছরের জানুয়ারি মাসের শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঐ মাসের পর অতিরিক্ত তারল্যের তথ্য হালনাগাদ করতে পারে নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে যে মে মাস পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে বিনিয়োগযোগ্য অলস তারল্যের পরিমাণ ২ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন যে তারল্য সংকটে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা ও মহামারী সৃষ্ট দুর্যোগে মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ বছর ধরে ব্যাপক উদারতা দেখিয়েছে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে রেপো, স্পেশাল রেপো ও এএলএসের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ ধার দেওয়া হয়েছে, তা অতীতে কখনই হয় নি। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ ধার না দিলে অনেকগুলো ব্যাংকই গ্রাহকদেরকে টাকা দিতে পারতো না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাত্র এক অর্থবছরে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ধার দিয়েছে। অন্যদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। রেমিট্যান্সের উচ্চপ্রবৃদ্ধির বিপরীতে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খরা নেমে আসে। এ কারণে ব্যাংকগুলোতে চলমান সংকট কমে গিয়ে উল্টো তারল্যের জোয়ার তৈরি হয়েছে।

দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পাদন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) ও নগদ অংশ সংরক্ষণ (সিআরআর) অনুপাত ঠিক রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কলমানি বাজার থেকে টাকা ধার করে। দেশের মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। কলমানিতে পর্যাপ্ত অর্থ না পেলে অন্য ব্যাংকের কাছে নিরাপত্তা (সিকিউরিটি) হিসেবে ‘ট্রেজারি বিল-বন্ড’ জমা রেখে রেপোতে ধার নেওয়া যায়। ব্যাংকগুলো এর বাইরে মার্কিন ডলার সোয়াপ করেও অন্য ব্যাংক থেকে ধার নিতে পারে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদের হার অনেক বেশি হলে কিংবা টাকা পাওয়া না গেলে তবেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়ে থাকে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অর্থ ধার দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো, স্পেশাল রেপো ও এএলএস ব্যবহার করে। রেপোর সুদের হার ৬% হলেও স্পেশাল রেপোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯% সুদ আদায় করে। সব মাধ্যম থেকে অর্থ পেতে ব্যর্থ যে কোনো ব্যাংক স্পেশাল রেপোতে ধার নিতে বাধ্য হয়। স্পেশাল রেপোর মাধ্যমে ধার দেওয়াকে বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রকার শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করে। করোনা ভাইরাসের সৃষ্ট দুর্যোগে মুদ্রাবাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে রেপোর সুদের হার কমিয়ে আনা হয়েছে। দুই দফায় রেপোর সুদের হার কমানোর ফলে তা ৪.৭৫% এ নেমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ডেট ম্যানেজমেন্ট’ বিভাগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে দেশে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ২০২০ সালের মার্চে রেপোতে ধার নেওয়ার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। মাসের শুরু থেকে দিন যত গড়িয়েছে, ততই রেপোতে ধার নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। গত বছরের ১লা মার্চ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৭৪৬ কোটি টাকা রেপোতে ধার নিয়েছে। অথচ ২৪শে মার্চ রেপোতে ধার নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার এ প্রবণতা গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেকর্ড ৫ লক্ষ ৫৪ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা ধার দিতে হয়েছিল। তবে জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার প্রবণতা কমতে থাকে। তা ধারাবাহিকভাবে কমে গত ডিসেম্বরে স্পেশাল রেপো ও এএলএসের মাধ্যমে ধারের পরিমাণ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। পুরো ডিসেম্বরে রেপোর পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় ব্যাংকগুলোকে এখন আর রেপো, স্পেশাল রেপো ও এএলএসের মাধ্যমে ধার করতে হচ্ছে না। তিনি বলেছেন যে গত অর্থবছরের শুরু থেকে ব্যাংক খাতে নগদ তারল্যের সংকট ছিল। এরপর দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে মানুষ ব্যাংক থেকে বেশি করে নগদ টাকা তুলতে থাকে। পরিস্থিতির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্যের যোগান দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের পর থেকে দেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যাংকগুলোকে আর ধার দিতে হয় নি। এখন দেশের ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগযোগ্য তারল্য আছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতি না হলে দেশের অর্থনীতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকার ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে সরকার জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। ফলে অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ না বেড়ে উল্টো ৪১৪৭ কোটি টাকা কমে গিয়েছে। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৫০ হাজার ৮০২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। অন্যদিকে দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও কিছুটা থমকে গেছে। প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণের পরও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮.৭৯% এ নেমে এসেছে, যা বেসরকারি খাতের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি। ঋণের চেয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অলস তারল্যের স্তূপ তৈরি হয়েছে।

শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম মনে করেন যে দেশের প্রায় সব ব্যাংকেই এই মুহূর্তে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তারল্য আছে। তিনি বলেছেন যে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের যে সংকট ছিল, তা গত বছরের সেপ্টেম্বরের পরে কেটে গেছে। করোনা মহামারীর শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্যের যোগান ও নীতি ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে যে উদারতা দেখিয়েছে, তা সত্যিই অভাবনীয়। দেশের মুদ্রাবাজার অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি লিকুইড। তাঁদের হাতে টাকা থাকলেও নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো ভালো ঋণ প্রস্তাব আসছে না। এ কারণে চাইলেও এই বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশের বেসরকারি খাতগুলোতে বিনিয়োগের বিরাট চাহিদা তৈরি হবে। ব্যাংকগুলোকে সে সময়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here